হবিগঞ্জের তিন উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ-জনবল সংকট

হবিগঞ্জের তিন উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে ওষুধ সরবরাহ। অন্য উপজেলাগুলোতেও ফুরিয়ে গেছে মজুদ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনবল সংকট। জেলার ১৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে নেই কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেক রোগী। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা।
সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ২২২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। প্রতিটি ক্লিনিকে দৈনিক গড়ে ৫০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। সেই হিসাবে প্রতিদিন ১১ হাজারের বেশি রোগীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভরসা এসব প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে প্রসূতি, শিশু এবং জ্বর, সর্দি, কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
নিয়ম অনুযায়ী, সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত এসব ক্লিনিকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও ২২ ধরনের ওষুধ দেওয়ার কথা। সিএইচসিপিরা মূল দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সহযোগিতা করার কথা স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ) ও পরিবারকল্যাণ সহকারীদের (এফডব্লিউএ)। কিন্তু ওষুধের ঘাটতির পাশাপাশি কর্মীর অভাবে ব্যাহত হচ্ছে এই সেবা।
বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলায় গত দুই মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। অন্য উপজেলাগুলোয় সামান্য ওষুধ এলেও তা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাজেট সংকটের কারণে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রমে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। গত সোমবার দুপুরে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শানবাড়ী কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় এক নারী বললেন, কয়েক দিন ধরে রোগীরা ওষুধ না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ইদানীং দুপুরের দিকে ক্লিনিকটি প্রায়ই বন্ধ দেখা যায়। একই সময়ে নবীগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ও বানিয়াচং উপজেলার শান্তিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকও বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
ওষুধ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রসূতি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা। লাখাই উপজেলার সিএইচসিপি সালমা জাহানের ভাষ্য, প্রসূতিরা নিয়মিত ক্লিনিকে এসে পরামর্শ নেন। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রনসহ বিভিন্ন ওষুধ দেওয়া হয়। শিশু ও অন্যান্য বয়সী রোগীরাও এখান থেকে বিনামূল্যে ওষুধ পেয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু সংকটের কারণে এখন শুধু পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে না।
লাখাই উপজেলার সিংহগ্রাম কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি আফসার মোল্লার দাবি, ক্লিনিকে মাসে অন্তত এক হাজার রোগী আসেন। কিন্তু এখন কাউকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি আয়রন ট্যাবলেট ছাড়া মজুদও নেই।
জনবল সংকটের কারণে কয়েকটি ক্লিনিকে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে কার্যক্রম। সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ডেমেশ্বর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, জেলার ১৩টি ক্লিনিকে সিএইচসিপি নেই। ফলে এসব কেন্দ্রে রোগীরা নিয়মিত পরামর্শ ও প্রাথমিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তার মতে, ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং শূন্য পদে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ সদরে ২০টি, লাখাইয়ে ২০, শায়েস্তাগঞ্জে ৬, মাধবপুরে ৩৬, চুনারুঘাটে ৩৪, নবীগঞ্জে ৩৯, বাহুবলে ২১, বানিয়াচংয়ে ২৯ ও আজমিরীগঞ্জে ১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকের মধ্যে নবীগঞ্জ ও বাহুবলে দুটি করে এবং অন্য কয়েকটি উপজেলায় সিএইচসিপির পদ শূন্য রয়েছে।
সংকটের কথা স্বীকার করেছেন হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন রত্নদ্বীপ বিশ্বাসও। তিনি বলেছেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় নিয়মিত ওষুধ সরবরাহের কথা। সাম্প্রতিক সংকটের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জনবল সংকট নিরসনেরও চেষ্টা চলছে।’



