জামালপুর
এক সেতুর অভাবে ১৫ হাজার মানুষ, ৭ বছরেও নেই সমাধান

ছবি: আগামীর সময়
বন্যার তীব্র পানির তোড়ে ভেঙে পড়া একটি সেতু। আর সেই সেতু না থাকায় বছরের পর বছর চরম দুর্ভোগে কাটছে অন্তত ১৫ হাজার মানুষের জীবন। শুকনো মৌসুমে কোনো রকমে সরু মেঠো পথ দিয়ে চলাচল করলেও যানবাহন চলাচল একেবারেই বন্ধ। আর বর্ষা এলেই বাড়ে ঝুঁকি, বাড়ে অনিশ্চয়তা।
জামালপুরের বকশীগঞ্জের আলীরপাড়া-গোপালপুর সড়কের টাকিমারি খালের সেতুটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম। ২০১৯ সালের ভয়াবহ বন্যায় ভেঙে যায় সেতুটি। এরপর কেটে গেছে সাত বছর কিন্তু এখনো পুনর্নির্মাণ হয়নি। ফলে উপজেলার অন্তত ১০ গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর অবশিষ্টাংশ এখনো পড়ে আছে ভাঙা অবস্থায়। সেতুর দুই পাশে পাকা সড়ক থাকলেও মাঝখানে সংযোগ না থাকায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পুরো সড়কটি। শুকনো মৌসুমে মানুষ পাশের সরু মাটির পথ দিয়ে হেঁটে বা মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করলেও চলতে পারে না কোনো যানবাহন। আর বর্ষা মৌসুমে সেই পথও ডুবে যায় পানির নিচে। তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
স্থানীয়রা জানান, এই সেতুটি ছিল তাদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। সেতু ভেঙে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। ধরারচর, ভাটিপাড়া, চরটসাপাড়া, গোপালপুর, সারমারা, বগারচর, খাসিরপাড়া, আলীরপাড়াসহ আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামের মানুষকে এখন যেতে হয় উপজেলা সদরে। আর এজন্য তাদের প্রায় ১০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ দিতে হচ্ছে পাড়ি। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। গাজী আমানুজ্জামান মডার্ন কলেজ ও আলীরপাড়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন অতিরিক্ত পথ দিতে হচ্ছে পাড়ি। অনেককে খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। বাড়তি ভাড়ার চাপও বহন করতে হচ্ছে তাদের পরিবারকে। বর্ষা মৌসুমে নৌকায় যাতায়াত করতে গিয়ে অনেক সময় বই-খাতা পড়ে যায় পানিতে। এমনকি নৌকা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে সবসময়।
এক শিক্ষার্থী জানান, শুকনো মৌসুমে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয় তাদের। আর বর্ষায় নৌকা ছাড়া উপায় থাকে না। এতে তাদের পড়াশোনা অনেক ব্যাহত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু শিক্ষার্থী নয়— রোগী পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কাজেই পড়তে হচ্ছে চরম বিড়ম্বনায়। কোনো রোগী হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও হয়ে পড়ে কঠিন। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে নিতে না পেরে পড়ছেন ক্ষতির মুখে।
গাজী আমানুজ্জামান মডার্ন কলেজের প্রভাষক জুলফিকার মামুনের সঙ্গে কথা হয়। বললেন, ‘সেতু না থাকায় আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সমস্যার মধ্যে পড়ে। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীসহ এলাকার হাজারো মানুষের উপকার হবে।’
এ বিষয়ে বগারচর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোহেল রানা জানান, ভাঙা সেতুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে একাধিকবার। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত এ বিষয়ে নেওয়া হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
‘টাকিমারি খালের ওপর সেতু নির্মাণের জন্য কয়েকবার পাঠানো হয়েছে প্রস্তাবনা। তবে এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে’, বললেন এলজিইডির বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. শামছুল হক।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেছেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি এখানে। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধানে নেওয়া হবে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টাকিমারি খালের ওপর নতুন সেতু নির্মাণে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে বরাদ্দের অভাবে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো প্রকল্পটি।

