হারমোনি ফেস্টিভ্যালের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে ফুলছড়া খেলার মাঠ

ছবি: আগামীর সময়
একসময় বিকেল হলেই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠ মুখর হয়ে উঠত শিশু-কিশোর, তরুণ ও চা-শ্রমিকদের হাসি-আনন্দে। কারও পায়ে ফুটবল, কারও হাতে ক্রিকেট ব্যাট—খেলাধুলার প্রাণচাঞ্চল্যে জমে উঠত পুরো মাঠ। কিন্তু সেই মাঠ এখন বালু, ইটের খোয়া, রাবিশ, ছোট-বড় লোহার টুকরা, পেরেক ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ছেয়ে আছে। প্রায় এক মাস ধরে খেলাধুলা বন্ধ থাকায় হতাশ স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী ও বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৯ থেকে ২১ জুন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ফুলছড়া চা-বাগান মাঠে তিন দিনব্যাপী ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল-সিজন–২’ অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসব উপলক্ষে মাঠজুড়ে অস্থায়ী মঞ্চ, স্টল ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। যাতায়াতের সুবিধার্থে মাঠে বালু ও ইট ফেলা হয় এবং বিভিন্ন স্থানে গর্ত খোঁড়া হয়। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার পরও মাঠটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। ফলে উৎসবের প্রস্তুতি ও আয়োজন মিলিয়ে প্রায় এক মাস ধরে মাঠে সব ধরনের খেলাধুলা বন্ধ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরেজমিন দেখা যায়, মাঠের বিভিন্ন স্থানে এখনো সিলিকা বালু, ইটের খোয়া, রাবিশ, লোহার টুকরা, পেরেক ও প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। স্টল নির্মাণের জন্য খোঁড়া গর্ত এবং বাঁশের খুঁটির চিহ্নও স্পষ্ট। কোথাও কোথাও অস্থায়ী চলাচলের জন্য তৈরি করা ইটের পথ সরিয়ে নেওয়া হলেও বালু সমান করা হয়নি। এতে মাঠের সমতলতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঘাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলার উপযোগী পরিবেশ আর নেই।
ফুলছড়া চা-বাগানের খেলোয়াড় রাসেল বানিয়া বললেন, এটি আমাদের একমাত্র খেলার মাঠ। হারমোনি ফেস্টিভ্যালের পর মাঠে ইটের টুকরা, বড় বড় পেরেক, কাদা-পানি ও বালু পড়ে আছে। আগে মাঠের এমন অবস্থা ছিল না। প্রায় এক মাস ধরে আমরা খেলতে পারছি না।
স্থানীয় বাসিন্দা রঞ্জিত নায়েক জানালেন, উৎসবের আগে আমাদের বলা হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে পুরো মাঠ পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। এখনো মাঠে প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা পড়ে আছে। মাঠ পরিষ্কারের জন্য ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তবে বিষয়টি সত্য কি না বা কার কাছে সেই টাকা দেওয়া হয়েছে, তা আমরা জানি না।
তিনি যোগ করেন, এটি শুধু একটি খেলার মাঠ নয়; চা-বাগান এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের অন্যতম কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত ফুটবল ও ক্রিকেট অনুশীলনের পাশাপাশি প্রীতি ম্যাচ, টুর্নামেন্ট, ফাগুয়া উৎসব এবং বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে।
খেলোয়াড় পল্লব বোনার্জী বললেন, হারমোনি ফেস্টিভ্যালের আগে মাঠটি খুব সুন্দর ছিল। উৎসবের সময় মাঠের চারপাশে গর্ত করে ড্রেন তৈরি করা হয়। কিন্তু পরে সেই ক্ষতগুলো আর মেরামত করা হয়নি। আমরা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও পঞ্চায়েতের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাদের দায়িত্বে আয়োজন হয়েছিল, মাঠ সংস্কারের দায়িত্বও তাদেরই।
তিনি জানালেন, দীর্ঘদিন মাঠটি অনুপযোগী থাকায় স্থানীয় তরুণদের নিয়মিত অনুশীলন ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ খেলোয়াড় তৈরির পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত মাঠটি সংস্কার না করা হলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান আগামীর সময়কে জানান, হারমোনি ফেস্টিভ্যালের কারণে মাঠের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী করে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক মহিবুল ইসলামের ভাষ্য, খেলার মাঠের বিষয়ে স্থানীয় শ্রমিক ও চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা দ্রুত মাঠটি মেরামত করে খেলাধুলার উপযোগী করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্যাটির সমাধান হবে এবং মাঠটি আবারও খেলাধুলার জন্য উপযোগী হয়ে উঠবে।





