নেভানো যায়নি ইনানীর গ্যাসের আগুন, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ

ইনানীতে নলকূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুন আপাতত জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা। ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খনন করতে গিয়ে মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীর থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুন আপাতত জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ কমে না আসা পর্যন্ত আগুন নেভানো বা গ্যাস বের হওয়ার পথ বন্ধ করা যাবে না। এতে ভূগর্ভে গ্যাস জমে উচ্চচাপ তৈরি হয়ে বিস্ফোরণের ঝুঁকি আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে টানা ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এড়াতে গ্যাস নির্গমনের স্থান ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরির সুপারিশ করেছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে কেন্দ্র থেকে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে রেড জোন, ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে নো ফায়ার জোন এবং ২০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে পর্যবেক্ষণ জোন হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে।
এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আজ শুক্রবার সকাল থেকে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করেছে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন। এ জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েবের সভাপতিত্বে সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন-২), উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার, কক্সবাজারের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন) মাহমুদুর রহমান, বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। কক্সবাজারে অবস্থানরত বাপেক্সের কারিগরি দলও অনলাইনে সভায় যুক্ত ছিল।
সভা শেষে সিদ্ধান্ত জানিয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েবের সই করা চিঠি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্যাস নির্গমনের স্থানে আগুনের শিখা কোনোভাবেই নেভানো যাবে না। একই সঙ্গে গ্যাস বের হওয়ার পথও খোলা রাখতে হবে। গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তা ভূগর্ভে জমে উচ্চচাপ তৈরি করতে পারে। এতে বিস্ফোরণ ঘটার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, আগামী ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহের পরিমাণ, গতিপ্রকৃতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে গ্যাসের প্রবাহ ধীরে ধীরে কমে এলে একপর্যায়ে তা প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে ১৫ দিনেও প্রবাহ না কমলে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।
নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্যাস নির্গমনের কেন্দ্র থেকে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এর বাইরের ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ আগুন বা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে, এমন সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
এ ছাড়া ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের পর্যবেক্ষণ জোনে বাপেক্সের কারিগরি দলের তত্ত্বাবধানে নতুন করে কোথাও গ্যাস নির্গমন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নো ফায়ার জোনের মধ্যে থাকা বৈদ্যুতিক লাইনগুলোর ওপরও সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বাড়িয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞ দলকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের সই করা গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন গ্যাস নির্গমনের স্থান থেকে ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আদেশ অমান্য করে কেউ নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ বা অবস্থান করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয় গণবিজ্ঞপ্তিতে।
গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ প্রবেশ করানোর পর হঠাৎ মাটি থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে।
ঘটনার পর প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। তবে তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। পরে মাটির গভীর থেকে অব্যাহতভাবে গ্যাস বের হওয়ার বিষয়টি সামনে এলে পরিস্থিতির কারিগরি দিক পর্যালোচনায় বাপেক্সের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। গ্যাস নির্গমনের ধরন বিবেচনায় দলটি প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানিয়েছেন, পেট্রোবাংলা ও বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।





