কচুরিপানার দখলে চলনবিল, বাড়ছে কৃষকের খরচ
- ঢেকেছে চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা
- ব্যাহত নৌযাতায়াত, বাড়ছে ভোগান্তি
- জমি পরিষ্কারে বাড়তি খরচ কৃষকের
- শ্রমিক সংকটে অনিশ্চিত মৌসুমি আবাদ
- কচুরিপানায় নষ্ট হচ্ছে বিলের সৌন্দর্য

চলনবিলের কচুরিপানা অপসারণ করছেন কৃষকরা। ছবি: সংগৃহীত
বর্ষায় থইথই পানিতে শাপলা, বক আর নৌকার ছুটে চলায় প্রাণ ফিরে পায় চলনবিল। তবে এবার সেই বিলে ছড়িয়ে পড়েছে কচুরিপানা। কচুরিপানার ঘন আস্তরণের ফলে জমি পরিষ্কার করতে বাড়তি শ্রমিক ও টাকা খরচ করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে মৌসুমি ফসলের আবাদ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে গিয়ে নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানির ওপর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ভাসছে কচুরিপানা। কোথাও কোথাও পুরো জলাশয় ঢেকে গেছে এর আস্তরণে। কচুরিপানার কারণে নৌকার পাখা আটকে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে পানিতে নেমে এগুলো সরিয়ে নৌকা চালাতে হচ্ছে মাঝিদের।
বর্ষায় চলনবিলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌকা। কিন্তু কচুরিপানার বিস্তারে সেই নৌযাতায়াতও হয়ে পড়েছে কঠিন। নৌকার গতি কমে যাওয়ায় সময় লাগছে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে কচুরিপানার ঘন স্তর এড়িয়ে যেতে হচ্ছে ঘুরপথে।
বিলশা গ্রামের কৃষক ওমর ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই প্রতি বছর খরচ হয় হাজার হাজার টাকা। কয়েক বছর ধরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কার্যকর সরকারি সহায়তা পাননি তারা। এখন টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় শ্রমিক। এতে মৌসুমি ফসল আবাদ নিয়ে পড়তে হচ্ছে অনিশ্চয়তায়।
বর্ষায় এ অঞ্চলের মানুষের চলাচলের প্রধান ভরসা নৌকা উল্লেখ করে নৌকার মাঝি আশরাফ হোসেন জানাচ্ছিলেন তার ভোগান্তির কথা। বলছিলেন, ‘এবার পুরো বিলেই কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দিয়ে নৌকা চালানো খুব কঠিন। অনেক দূর ঘুরে যেতে হয়। নৌকার পাখায় কচুরিপানা আটকে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকা থেমে থাকে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মমিন হাজির আক্ষেপ, আগে সহজেই এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়া যেত নৌকায়। এখন কচুরিপানার কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে সেই চলাচল। জমি থেকেও কচুরিপানা সরাতে লাগছে বাড়তি শ্রমিক। ফলে বাড়ছে কৃষকের খরচ।
চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় আমন ধান, আগাম সরিষা, গম, বোরো ধানসহ আবাদ হয় বিভিন্ন ফসলের। কৃষকদের আশঙ্কা, জমিতে কচুরিপানা জমে থাকলে সময়মতো ব্যাহত হতে পারে চাষাবাদ। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি কমতে পারে ফলনও।
নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুর ইসলাম খান পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরে জানালেন, অর্থ সংকটে জমি অনাবাদি রাখছেন অনেক কৃষক। এতে কমে যেতে পারে উৎপাদন। ফসল আবাদের আগে জমি থেকে কচুরিপানা সরিয়ে ফেলার পরামর্শও দিলেন তিনি।
কচুরিপানার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকরাও। চলনবিলে বেড়াতে আসা হাবিবুর রহমান বাবুর আক্ষেপ, ‘অনেক বছর পর বন্ধুদের সঙ্গে বিল দেখতে এসেছি। কিন্তু বিল জুড়ে কচুরিপানা দেখে হতাশ হলাম। মাঝপথে আমাদের নৌকাও কচুরিপানায় আটকে যায়। পরে পানিতে নেমে কচুরিপানা সরিয়ে নৌকা চালাতে হয়েছে।’
একই অভিযোগ আরেক পর্যটক সুজন আহমেদের। তার ভাষ্য, চলনবিলের আগের জৌলুশ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যত দূর চোখ যায়, শুধু কচুরিপানা দেখা যায়। এতে বিলের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চলনবিল কৃষি ও মৎস্য সম্পদের পাশাপাশি বর্ষায় দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় জলাভূমি। শাপলা, পাখি, মাছ, নৌকা ও জেলেদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকে বিল। কিন্তু কচুরিপানার বিস্তার সেই স্বাভাবিক পরিবেশে ফেলছে ছেদ।
তাদের দাবি, কৃষিজমি ও নৌপথ সচল রাখতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে কচুরিপানা অপসারণের। পাশাপাশি কেন কচুরিপানার বিস্তার বাড়ছে, তা চিহ্নিত করে নিশ্চিত করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা। তা না হলে চলনবিলের নীল জলরাশির বদলে একসময় কচুরিপানার সবুজ আস্তরণই এর প্রধান পরিচয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।






