‘আমরা টাকা চাই না, চাই মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই’

‘আমরা টাকা-পয়সা চাই না। ৪২টি পরিবারের জন্য একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন। আমরা শুধু পরিবার নিয়ে একটু মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই চাই।’ কথাগুলো রাজশাহী নগরীর নতুন বুধপাড়া রেলওয়ে বস্তির বাসিন্দা জাহেদা বেগমের। তার কণ্ঠে অসহায়ত্ব। চোখের সামনে নাতি ধুঁকছে। দুটি কিডনিই নষ্ট। মাত্র ১০ শতাংশ কার্যক্ষমতা নিয়ে বেঁচে আছে শিশুটি। মাসের বেশির ভাগ সময় কাটে হাসপাতালে। অথচ এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই বলে আক্ষেপ তার।
আগামী ৩১ অক্টোবর বিশ্ব নগর দিবস উপলক্ষে ‘শহরের পুনরুজ্জীবন: সকলের জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান’ শীর্ষক সংলাপে উঠে আসে বস্তিবাসীর এমন জীবনসংগ্রামের কথা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্তোরাঁর সম্মেলনকক্ষে উন্নয়ন সংস্থা বারসিক এ সংলাপের আয়োজন করে। বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় গবেষণা নীতিপত্র উপস্থাপন করেন বারসিকের রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ও নৃবিজ্ঞানী মো. শহিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব নিলুফার ইসমত আরা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাহেদা জানালেন, তার নিজেরও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। দুই সন্তান পড়াশোনা শেষ করেও চাকরি পাচ্ছেন না। পানি ও বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। যে বস্তিতে ৪২টি পরিবারের বসবাস, সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তাও নেই। জাহেদার এই কষ্ট শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। রাজশাহী নগরীর অন্তত ১০৪টি বস্তিতে বসবাস করা মানুষের জীবনেও রয়েছে এমন অনিশ্চয়তা। কারও ঘরে বর্ষায় পানি ওঠে। কারও ঘরের পাশে রেললাইন। কোথাও নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কিংবা নিরাপদ বাসস্থান। এর সঙ্গে আছে উচ্ছেদের ভয়। যেকোনো দিন ঘর ছেড়ে পথে নামতে হতে পারে-এমন শঙ্কা নিয়েই দিন কাটে অনেকের।
সংলাপে বস্তিবাসীরা শুধু তাদের দুঃখের কথা বলেননি। তুলে ধরেছেন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারও। নগরীর চৌদ্দপাই বস্তির বাসিন্দা পাপিয়া সুলতানা জানালেন, সেখানে ২২টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। বর্ষায় ঘরে পানি ওঠে। মশা, পোকামাকড় ও সাপের উপদ্রবে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। কর্মকর্তাদের কাছে বারবার গিয়েও মিলেছে শুধু আশ্বাস। পাপিয়ার প্রশ্ন, ‘আমরা কি এ দেশের নাগরিক নই? আমরা ভোটার, তবু আমাদের থাকার জায়গাটুকু নেই।’ তাঁর দাবি, সরকারি খাসজমিতে তাদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অন্তত একবার বস্তিতে গিয়ে দেখুন, কীভাবে বেঁচে আছেন তারা।
নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বহরমপুর বস্তির বাসিন্দা মো. মতিয়ার শেখের কষ্টও একই। তারা রিকশা চালান, রাজমিস্ত্রি ও রংমিস্ত্রির কাজ করেন। মানুষের বাড়িঘর পরিষ্কার করেন। তাদের শ্রমে শহর সচল থাকে। অথচ নিজেদের বস্তিতে নেই ভালো শৌচাগার, পানির লাইন, খেলার মাঠ, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা নিরাপদ বাসস্থান। মতিয়ার বললেন, ‘কাজের সময় আমরা আপনজন, কাজ শেষ হলে কেউ আমাদের চেনে না।’ ভোটের সময় নাগরিক হিসেবে তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভোটের পর তাদের সমস্যার খোঁজ কেউ রাখে না বলে অভিযোগ তার।
রাজশাহীকে ‘গ্রিন সিটি’ করতে হলে বস্তিবাসীকেও নগর পরিকল্পনায় যুক্ত করার দাবি জানালেন তিনি। তার মতে, উন্নয়নের নামে রিকশা বা দোকান সরিয়ে মানুষের জীবিকা বন্ধ করে দিলে তাদের সংসার চলবে কীভাবে, সেটিও ভাবতে হবে। বস্তির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল, খেলার মাঠ ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা জরুরি। বস্তির শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এই বাস্তবতা দেখেছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ছোট্ট স্বপ্ন’-এর সাধারণ সম্পাদক মো. রকি আলী। তালাইমারী ফুলতলা নদীর ঘাটের বস্তিতে প্রায় ১২০টি শিশুকে পড়াশোনায় সহায়তা করে তাঁর সংগঠন। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের পাঁচ থেকে সাতটি গ্রামের শিশুদের নিয়েও চলে শিক্ষামূলক কার্যক্রম।
রকি আলী বললেন, নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার বস্তিতে আশ্রয় নেয়। ছোট্ট একটি ঘরে পুরো পরিবারের বসবাস যে কতটা কষ্টের, তা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তার দাবি, বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ না করে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (আরডিএ) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। বস্তিবাসীর অবস্থা যাচাই ও তথ্য সংগ্রহে সামাজিক সংগঠনগুলোও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
স্থানীয় সামাজিক স্কুলের সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা-তুজ-জোহরা বললেন, একবার পড়াতে গিয়ে বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে উচ্ছেদের আতঙ্ক দেখেছেন। তাদের বলা হয়েছিল, দু-এক দিনের মধ্যে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। অথচ একটি পরিবার কোথায় যাবে, কীভাবে নতুন করে ঘর বাঁধবে, তা ঠিক করতে সময় ও অর্থ দুটোই প্রয়োজন। আড়াই শতাধিক মানুষের ভবিষ্যৎ বিবেচনা না করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বললেন, সভা-সেমিনারে বস্তিবাসীর কষ্টের কথা শোনার পর বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। কাজের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীকে জীবিকার জন্য ঢাকাসহ বড় শহরে যেতে হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিন বললেন, বস্তিবাসীকে বাদ দিয়ে টেকসই নগর গড়া সম্ভব নয়। উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাজশাহীর খাসজমি চিহ্নিত করে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে স্বল্প ব্যয়ে ঘর নির্মাণে সরকারি সহায়তা বা ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যায়। তার মতে, নগর পরিকল্পনার আগে গবেষণা ও জরিপ জরুরি। শহরে কত মানুষ কোন পেশায় যুক্ত, কোথায় থাকেন এবং তাঁদের কী প্রয়োজন- এসব তথ্য সংগ্রহে সিটি করপোরেশনের গবেষণা সেল গঠন করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সংগঠনকে এ কাজে যুক্ত করতে হবে। কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী বাজার, গণশৌচাগার, স্বাস্থ্যসেবা ও জলাশয় রক্ষায়ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ না করে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন রুলফাওয়ের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন, নদী গবেষক ও গ্রিন কোয়ালিশন বরেন্দ্র অঞ্চলের সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সাকিবুর রহমান এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহিদুর রহমান। বস্তিবাসী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দাবি তুলে ধরেন। বস্তিবাসীর কথাগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে একটি দাবি- তারা করুণা চান না, চান অধিকার। নিরাপদ আশ্রয়, সুপেয় পানি, চিকিৎসা ও সন্তানদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের আগে চান পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা।
শহরকে সুন্দর করার পরিকল্পনা হয়তো সড়ক, স্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা দিয়ে শুরু হতে পারে। কিন্তু সেই শহরের শ্রমজীবী মানুষগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকলে উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। জাহেদা বেগমের মতো মানুষের কাছে তাই স্বপ্নটা খুব ছোট- পরিবার নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকা। সেই স্বপ্ন পূরণই হতে পারে সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।





