বেতন তোলেন রাজবাড়ীতে থাকেন রাজধানীতে

থাকার কথা দুই চিকিৎসক। রয়েছেন মাত্র একজন। তাকে আবার বেশিরভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয় প্রশাসনিক কাজে। এমন পরিস্থিতিতে যা হওয়ার হয়েছে তাই; শিকেয় উঠেছে নারুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্যসেবা। রোগীরা তো বটেই, ক্ষুব্ধ রোগীর স্বজন ও স্থানীয়রা।
এ চিত্র শুধু নারুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রেরই না, জেলার বেশিরভাগ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেরও। সারাদেশের অবস্থাও প্রায় একই রকম। প্রান্তিক এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবস্থান অনীহায় দিনের পর দিন পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর। এর কারণ অবশ্য, স্বাস্থ্যসেবা খাতের রাজনীতি। ফলে সরকার আসে সরকার যায়; কিন্তু স্বাস্থ্যরাজনীতি কারবারিরা নানা অপকর্ম করতে থাকেন বছরভর।
রাজবাড়ীর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের হলেও তা জটিল আকার ধারণ করেছে অ্যাটাচমেন্ট নামের এক প্রশাসনিক পরিভাষায়। বাংলায় যাকে বলা হয় সংযুক্তি। জেলার ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসারের পদ রয়েছে ১৬৫টি। কর্মরত আছেন ১০৫ জন। তাদের মধ্যে আবার ২২ জন রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত, থাকেনও সেখানে। শুধু বেতন তোলেন রাজবাড়ী থেকে। কর্মস্থলে না থাকায় বাস্তবে সেবা দিচ্ছেন না তারা।
অথচ সংযুক্তির প্রথা হচ্ছে, যেখানে ভরপুর চিকিকৎসক রয়েছেন সেখান থেকে ঘাটতি জায়গায় পাঠানো। রাজবাড়ীতে এমনিতেই চিকিৎসক কম। তার ওপর সেখান থেকে সংযুক্তির বৈধ সার্টিফিকেট নিয়ে তারা থাকছেন ঢাকায়।
এই সংযুক্তি কিন্তু সব চিকিৎসকরা পান না। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) বা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মতো সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্বাস্থ্যরাজনীতি কারবারিদের সঙ্গে ভালো আঁতাত ক্ষমতা আছে তারাই পান এসব সুবিধা।
রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ। তার মত, ‘অন্যত্র ডাক্তার সংযুক্তির বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবহিত। ডাক্তার সংকটের প্রভাব পড়েছে সদর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। দ্রুত সংযুক্ত চিকিৎসকদের নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে এনে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
সংযুক্ত ডাক্তাররা আর মূল কর্মস্থলে ফেরেন না
সংযুক্ত থাকা চিকিৎসকদের কারণে এসব পদ শূন্য হিসেবে দেখানো হয় না। ফলে নতুন করে নিয়োগ বা পদায়নের উদ্যোগও কম নেওয়া হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী করছে সংকটকে।
জেলায় কর্মরত এক চিকিৎসকের ভাষ্য, ‘সংযুক্ত ডাক্তাররা আর মূল কর্মস্থলে ফেরেন না। একবার যারা সংযুক্তির সোনার হরিণ নিয়ে ঢাকা যান তারা সেখানেই থিতু হন। কিছু বলে লাভ নেই, বাস্তবে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কেউ ভাবে না।’
রাজবাড়ীতে ২৪টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র, যা পরিচিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নামেও। তার মধ্যে ১৯ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রেই মেডিকেল অফিসার নেই। তারা সংযুক্তিতে রয়েছেন ঢাকায়। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসকশূন্যতা তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের ওই সব এলাকার হাজার হাজার মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তারা ছুটছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীর দীর্ঘ লাইন। চিকিৎসক স্বল্পতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেককেই। একজন চিকিৎসককে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রাজবাড়ীতে চিকিৎসক সংকট থাকার পরও ২২ জন চিকিৎসক ঢাকায় সংযুক্ত। এটি কীভাবে, কার স্বার্থে অনুমোদন পেল এবং কবে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে? এ প্রশ্নের জবাব প্রশাসনের কেউ দিতে চান না। অথচ সরকারের অবস্থান স্বাস্থ্যসেবা যাবে নাগরিকের দোরগোড়ায়। গ্রাম থেকে ঢিকিৎসক শহরে নিয়ে সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা? উত্তর মেলেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারোর কাছ থেকেও।
‘রবিবার সংযুক্ত সব শেষ করবো। এরপর ডাক্তার দেওয়া শুরু করবো।’
তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন (এমপি) আশাবাদী। ‘রবিবার সংযুক্ত সব শেষ করবো। এরপর ডাক্তার দেওয়া শুরু করবো।’
পাংশা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল সেবা নিতে এসেছিলেন আফরোজা বেগম। তার অভিযোগ, ‘দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি; কিন্তু সেভাবে সময় পাইনি, অনেক রোগী তো। ডাক্তার দেখছেন ঠিকই কিন্তু সমস্যাগুলো বিস্তারিত বলার সুযোগ কম আমাদের।’
পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৪ জন। শূন্য ৭টি পদ। একইভাবে মেডিকেল অফিসারের ৩১টি পদের মধ্যে শূন্য ১১টি। বালিয়াকান্দিতে ১০টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে ৭টি শূন্য এবং ২৮টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে শূন্য ৯টি।
গোয়ালন্দে জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের বিপরীতে শূন্য ৬টি এবং মেডিকেল অফিসারের ২৫টি পদের মধ্যে ৭টি শূন্য। কালুখালীতে ৪টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে ২টি এবং ২৬টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ৯টি শূন্য রয়েছে। রাজবাড়ী সদর উপজেলাতেও শূন্যতা রয়েছে, যদিও তুলনামূলক কম।
কোনো রকমে ঘসঘস করে কিছু লিখে বিদায় করেন রোগী
কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল বৃহস্পতিবার রোগী নিয়ে গিয়েছিলেন খালেক মিয়া। তার ক্ষোভ, ‘মৃগী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতে হচ্ছে। এখানে এসে দেখি আরও বেশি ভিড়, ডাক্তারদেরও অনেক চাপ। কোনো রকমে ঘসঘস করে কিছু লিখে বিদায় করেন রোগী।’
একাধিক চিকিৎসক সংযুক্তিতে থাকার কথা জানিয়েছেন পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গিয়াস উদ্দিন খান। তার মত, ‘সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকরা চলে যাওয়ার পর থেকেই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর চিকিৎসা কার্যক্রম কিছুটা স্থবির। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোও হয়েছে একাধিকবার। তবে হয়নি কোনো সুরাহা।’















