গুদামে মজুদ সার, খালি হাতে ফিরছেন কৃষক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আমন মৌসুমে সার সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। প্রয়োজনীয় সার কিনতে ডিলার ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কোথাও চাহিদার তুলনায় অল্প সার দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও দিনের পর দিন ডিলারের দোকানে ঘুরেও মিলছে না সার। বাধ্য হয়ে বেশি দামে কালোবাজার থেকে সার কিনছেন অনেকে। অথচ প্রশাসনের অভিযানে একের পর এক জায়গা থেকে মিলছে বিপুল পরিমাণ মজুদ করা সার।
সর্বশেষ গত সোমবার রাতে উপজেলার ছাপড়হাটি ইউনিয়নের শোভাগঞ্জ বাজারে একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ২০৯ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। কৃষকদের কাছে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব সার মজুদ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট পৌর শহরের মীরগঞ্জ বাজারে একটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে মজুদ করা সার পাওয়ায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এরও আগে ২১ আগস্ট বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের নগর কাঠগড়া বাজারে ১২ বস্তা সার আটক করেন স্থানীয় লোকজন।
কৃষকদের অভিযোগ, তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না প্রয়োজনীয় সার। অথচ মজুদদারদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে বস্তার পর বস্তা সার। ফলে উপজেলায় সত্যিই সার সংকট রয়েছে, নাকি পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা। সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে কৃষকদের।
বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক মোতালেব সরকার বলেন, ‘জমিতে সার দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় আছে। সে সময় দোকানে সার না পেলে আমরা কী করব? পরে শুনি কোথাও বস্তার পর বস্তা সার মজুদ রাখা হয়েছে। তাহলে আমাদের জন্য সার নেই কেন?’
একই অভিযোগ মজিবর রহমান নামে আরেক কৃষকের। তিনি বলেন, ‘সরকারি দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও সংকটের কথা বলে খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানে যখন এত সার পাওয়া যাচ্ছে, তখন সার বিতরণের পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখা দরকার।’
তবে কৃষি বিভাগ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, উপজেলায় সার সংকট নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরী জানান, আমন মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগস্টে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন সার বিতরণ করা হয়েছে। চলতি মাসে আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ টন সার বিতরণের কথা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের এই বক্তব্যের পরও মাঠপর্যায়ে সংকটের অভিযোগ থাকায় শুধু সরবরাহ নয়, সার বিতরণের প্রক্রিয়াটিও আলোচনায় এসেছে। কৃষকদের অভিযোগ, সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়লে কিছু লোক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার সংগ্রহ করে পরে তা মজুদ করেন বা অন্যের কাছে বিক্রি করেন। পরিচিত কৃষক কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে সার সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, ভাড়া করা লোক দিয়েও সার সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিলার পয়েন্টে সার আসার খবর আগেই সংগ্রহ করে একটি চক্র। এরপর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮ থেকে ১০ জন, কখনো তারও বেশি মানুষকে লাইনে দাঁড় করানো হয়। তাদের অনেকের নিজের জমি নেই। কৃষিকাজের সঙ্গেও তারা যুক্ত নন। প্রতি বস্তা সার সংগ্রহের জন্য তাদের ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ কৃষকদের।
ছাপড়হাটি ইউনিয়নের কৃষক শহিদুল ইসলামের দাবি, ‘সচ্ছল কৃষকরা যেকোনোভাবে সার সংগ্রহ করতে পারেন; কিন্তু প্রান্তিক কৃষকরা সময়মতো না পেলে পুরো মৌসুম ঝুঁকিতে পড়ে যান।’
তবে বাস্তব সংকটের পাশাপাশি গুজব ও আতঙ্কও পরিস্থিতিকে জটিল করছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। কোথাও সার পাওয়া যাবে না, এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকে আগেভাগেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কিনতে ছুটছেন। এতে ডিলার পয়েন্টে একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ মজুদদারির বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় চলছে অভিযান। সার যাতে কালোবাজারে না যায়, সেজন্য ডিলার পয়েন্টে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজে রাখা হয়েছে। তবে একসঙ্গে অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে ভাড়া করা লোক শনাক্ত করা কঠিন।’
সার সংকট নেই দাবি করে কৃষকদের গুজবে কান না দেওয়া এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার সংগ্রহ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।






