যশোরে জাবির হোটেলের আগুন, দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যশোরে জাবির হোটেলের অগ্নিকাণ্ড— সংগৃহীত
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের দিনে যখন সারা দেশের মতো যশোরেও আনন্দ মিছিল হওয়ার কথা ছিল, ঠিক তখনই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শোকের নগরীতে পরিণত হয় পুরো শহর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিজয় মিছিল বের হলেও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন জাবির হোটেলে আগুন লাগার ঘটনায় শিশু, একজন ইন্দোনেশীয় নাগরিকসহ নিহত হন ২৪ জন।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আগুনে পুড়ে নয়, ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ঘটনার দুই বছর পরও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি এবং প্রকৃত দায়ীদের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কানিজ ফাতেমা বলেছেন, ‘ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরপরই ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ আর্তনাদ শুনেছি। আটকে পড়াদের উদ্ধারে আমার ভাই সাদ তার বন্ধুর সঙ্গে উপরে চলে যায়। তার বন্ধু নেমে এলেও আমার ভাই মারা যায়। আমরা হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাচ্ছি, আবার ফিরছি। কিছুক্ষণ পরে ফোনে আমাকে জানানো হলো, সাদ মারা গেছে।’
তিনি আরও জানান, এরপর চলে যাই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে দিয়েছিল উত্তেজিত জনতা। লোকজনকে বুঝিয়ে একটি গাড়ি নিয়ে বের হলেও তাতে পানি ছিল না। জাবিরের পেছনের লালদীঘি থেকে পানি নিয়ে সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সব শেষ। ওই সময় একটি হেলিকপ্টার এসে একজনকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পরে জেনেছি, তিনি জাবিরের একজন স্টাফ ছিলেন।
উদ্ধারকাজে যুক্ত পরশমণি বললেন, ‘আগুন নিয়ন্ত্রণের পর আমরা উপরে গিয়ে দেখেছি মদের বোতল, লাশ পড়ে আছে। একজন ইন্দোনেশীয় নাগরিকের লাশের পাশে একটি জায়নামাজ ছিল। আধুনিক এই হোটেলে অটোমেটিক আগুন নেভানোর যন্ত্র ছিল, কিন্তু সেগুলো কাজ করেনি। প্রায় প্রতিটি ফ্লোরের দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়েছে। ঘটনার কিছুদিন পরে পুলিশের সঙ্গে আলাপকালে শুনতে পারি, নিচে গানপাউডার দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছিল। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, আগুনে জাবির হোটেলের একজনও মারা যায়নি।’
অ্যাম্বুলেন্সচালক শেখ মিলন স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘বিকাল ৪টার দিকে হাসপাতালে থাকাকালেই পোড়া রোগী নিয়ে আসা এক ব্যক্তি বলেন, ‘জাবিরে ব্যাপক আগুন, আপনারা তাদের উদ্ধার করুন।’ সেই কথা শুনেই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। উপরে গিয়ে দেখি, লাশ আর লাশ। পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশের চেয়ে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ১০ থেকে ১২টি লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাই। মনে হচ্ছিল, তারা গভীর ঘুমে।’
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মারুফ হাসান সুকর্ণ বলেছেন, ‘৫ আগস্ট দুপুর নাগাদ জানতে পারি শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। আমরা বিজয় মিছিল নিয়ে বের হওয়ার পর শহরের ভেতরে ঢুকে হঠাৎ আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পাই। যখন হোটেলের কাছে পৌঁছাই, সেখানে আগুন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। পরে জানতে পারি, সেখানে ২৫টি লাশ ছিল। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই সত্য উদ্ঘাটন জরুরি বলে মনে করি। এক মাসের বেশি সময় আমরা যশোরের রাজপথে ছিলাম, কিন্তু কোনো নৈরাজ্যকর ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করে বিজয়ের দিনে এমন নৃশংস ঘটনা কেন ঘটল, তার সত্য উদ্ঘাটন ও দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত।’
ঘটনার ১৩ দিন পর, ১৮ আগস্ট শাহীন চাকলাদারের চাচাতো ভাই তৌহিদুল ইসলাম চাকলাদার ওরফে ফন্টু চাকলাদার কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৫ আগস্ট বিকাল ৩টার দিকে প্রায় ২০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি অস্ত্র, গানপাউডার ও পেট্রোল নিয়ে জাবের প্যারাডাইজ লিমিটেডে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে লুটপাট চালিয়ে নগদ ৯০ লাখ টাকা, ১০০টি ফ্রিজ, ১০০টি স্মার্ট টেলিভিশন, দুটি জেনারেটর, কয়েকশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ট্রান্সফরমার সাবস্টেশন, প্রেসার পাম্প, ফায়ার স্টেশনের মালামাল, ফায়ার ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে। পরে গানপাউডার ও পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলে ১৬ তলা ভবনটি পুড়ে যায় এবং একজন ইন্দোনেশীয় নাগরিক, হোটেল স্টাফসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়।
মামলাটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন। তিনি জানান, এ মামলায় বিভিন্ন সময় ৭ জনকে আটক দেখিয়ে আইনানুগভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এখনো তদন্ত চলছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, আটক হওয়া ৭ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক ছাড়া অন্য সবাই জামিনে রয়েছেন। এরপর নতুন করে কাউকে আটক করা হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বললেন, ‘সেদিন সকাল থেকেই গোটা দেশের পরিবেশ উত্তপ্ত ছিল। ফ্যাসিজমের পতনের প্রত্যাশায় রাজপথে উপচেপড়া মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল। আমরা দলীয়ভাবে বৈঠকে বসেছিলাম, যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়। দুপুরে জানতে পারি, শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিটিং বন্ধ করে আমরা ছুটে যাই। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় অল্প সময়েই সব শেষ হয়ে যায়। এরপর পূজামন্ডপ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে যাতে হামলা না হয়, সে জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিই। জাবিরের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলা তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমরা চাই, এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা হোক। আদালতই তাদের শাস্তি দেবেন।’
এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যশোরের জাবির হোটেল ট্রাজেডিতে নিহতদের শহীদ তালিকা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি গেজেট প্রকাশের পর ফজল মাহাদী চয়নসহ যশোরের তিনজনকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, চয়ন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং অন্য দুজনের সঙ্গে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। এ অভিযোগের পর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।






