পাতে উঠছে না পোলাও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাতীয় মাছ রুপালি ইলিশ সাধারণের পাত (থালা) থেকে উঠে গেছে অনেক আগেই। ঠিক তেমনি চিনিগুঁড়া চালের পোলাও এখন পাতে তোলাও দায় হয়ে পড়েছে মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির। গত এক মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি অন্তত ৫০ টাকা। গত ছয় মাসের তুলনায় বেড়েছে ১০০ টাকা। আতপ চালের এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে ছোটখাটো অনুষ্ঠানাদি (যেখানে পোলাওসহ উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করা হয়) বর্জন করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
চিনির দানার মতো ছোট ও চকচকে দেখতে চিনিগুঁড়া চাল সাধারণত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল তথা দিনাজপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা ও নাটোর জেলায় বেশি উৎপাদিত হয়। তবে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন কম এবং সরকারের দেশের বাইরে চিনিগুঁড়া চাল রপ্তািনর অনুমতিকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি চিনিগুঁড়া চাল রপ্তানির অনুমতি পাওয়ার পর বাজারে বৈধ পন্থা ছাড়াও অন্য পণ্যের মোড়কে দেশের বাইরে চিনিগুঁড়া চাল পাচার হচ্ছে। তা ছাড়া এ চালের উৎপাদন কম হওয়ায় দাম লাফিয়ে বাড়ছে। তবে রপ্তানির অনুমতির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা (সহকারী নিয়ন্ত্রক) আরিফ আহমদ জানালেন, সুগন্ধি চাল শর্তসাপেক্ষে রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই ৬৭ জন ব্যবসায়ীকে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যে চাল গত মাসেও ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২৩০ টাকায়। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৩০ টাকায়। যদিও ছয় মাস আগে চিনিগুঁড়া চাল (আতপ) প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। মাহিগঞ্জ এলাকার চালের আড়তদার মাসুম মিয়া দামবৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানালেন, বিভিন্ন প্রজাতির চালের দামের তুলনায় চিনিগুঁড়া চলের দাম এক লাফে দ্বিগুণ হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে এ চালের চাহিদা থাকায়, বড় বড় ব্যবসায়ীরা বৈধ এবং অবৈধভাবে এ চাল বিদেশে পাঠানোতে দামের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
রংপুর সিটি বাজারে আতপ চাল কিনতে আসা ক্রেতা নয়ন মিয়া বললেন, ‘আগে মাসে দুই-তিন কেজি চিনিগুঁড়া চাল কিনতাম। এখন এক কেজি কিনতেই হিসাব করতে হয়। বাচ্চাদের জন্য বা অতিথি এলে পোলাও রান্না করাও কঠিন হয়ে গেছে।’ দামবৃদ্ধির কারণে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানই বাদ দিতে হচ্ছে নগরীর ধাপ এলাকার রিকশাচালক উমর আলীর। এদিকে বাজারে এত কম সময়ে চিনিগুঁড়া চালের দাম এত বৃদ্ধির কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রেতারা। এ ছাড়া কার্যকর বাজার তদারকির অভাবে অসাধু চক্র দামবৃদ্ধির এ কাজটি করছে বলে তাদের ধারণা। রংপুরের খুচরা চাল ব্যবসায়ীরা জানালেন, ৫০ কেজির একেকটি চিনিগুঁড়া চালের বস্তার দাম এক মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা বাড়ায় খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে। এদিকে চালের দাম বাড়ার জন্য করপোরেট কোম্পানিগুলোকে দায়ী করছেন পাইকারি চাল ব্যবসায়ী আব্দলি হাকিম। তার ভাষ্য, করপোরেট কোম্পানিগুলো প্যাকেটজাত চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় খোলাবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিলমালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না, যার জন্য দাম বাড়াতে হচ্ছে। বাজারে অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।




