আগাছার আড়ালে ৪০০ বছরের মন্দির

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর মানুষের কোলাহলে একসময় মুখর ছিল রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুড়াদহ গ্রামের জোড় মন্দির। পূজা, রাসলীলা ও মেলাকে ঘিরে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম হতো। ৪০০ বছরের পুরনো সেই মন্দির প্রাঙ্গণ এখন নীরব। চারপাশে আগাছা, বাঁশঝাড় ও জঙ্গল। কোথাও দেয়াল ভেঙে পড়েছে, কোথাও ধসে গেছে কক্ষ। ইটের গায়ে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। অবশিষ্ট স্থাপনাটুকু যেন নীরবে বলে যাচ্ছে হারিয়ে যেতে বসা এক জনপদের গল্প।
উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের এই স্থাপনা স্থানীয়ভাবে জোড় মন্দির নামে পরিচিত। স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। তবে প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা। স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক বই ‘গঙ্গাচড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যে’ মন্দিরটি অষ্টাদশ শতক বা তারও আগে নির্মিত বলে উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসের সেই ইঙ্গিত মেলে স্থাপনার ধ্বংসাবশেষেও। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় মন্দিরে দুটি দোতলা চূড়া ও চারটি ছোট চূড়া ছিল। প্রবেশপথের দুপাশে ছিল সিংহের মূর্তি। এখন টিকে আছে মাত্র একটি চূড়া। দেয়ালে এখনো দেখা যায় পোড়ামাটির নকশা। স্থাপত্য ও ইটের ধরন দেখে এটিকে অষ্টাদশ শতক বা তারও আগের ‘নবরত্ন’ মন্দির বলে ধারণা করা হয়। মন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কিছু স্থাপনার স্মৃতি। পাশে ছিল ‘শেখ কুয়া’, যেখানে কষ্টিপাথরের কয়েকটি মূর্তি ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। দক্ষিণ পাশে ছিল একই সময়ের তিনতলা একটি মঠ, যা পাকিস্তান আমলে ধ্বংস হয়ে যায়। এসব তথ্যের পাশাপাশি মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। কিন্তু কোনটি ইতিহাস আর কোনটি জনশ্রুতি, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবীণদের স্মৃতিতে মন্দিরটির অতীত বেশ জীবন্ত। স্থানীয় বাসিন্দা বাবু জামিনী চন্দ্র বলেছেন, ‘একসময় মন্দিরটি ছিল দোতলা; ইটের গায়ে ছিল নানা কারুকাজ ও প্রাণীর অবয়ব। নিয়মিত পূজা, রাসলীলা ও মেলাকে ঘিরে জমজমাট থাকত প্রাঙ্গণ।’
কুমোদ রায়ের স্মৃতিতেও মেলার দিনগুলোয় দূরদূরান্ত থেকে মানুষের আসার কথা উঠে আসে। তবে সেই জমজমাট সময় থেমে যায় ধীরে ধীরে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রংপুরের ফিল্ড অফিসার আবু সাইদ ইনাম তানভিরুলের ভাষ্য, স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাইয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিদর্শনের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে প্রতিবেদন।
আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে সংরক্ষণের জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে প্রতিবেদন।





