আসলামের সংগীত জাদুঘর

আজকের সংগ্রহ আগামী দিনের সম্পদ, আগামী দিনের ঐতিহ্য। কিন্তু এই সংগ্রহের কাজটিই সবার করা হয় না। গুরুত্বও দেন না অনেকে। এ কারণে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক কিছুই আজ লুপ্ত প্রায়। তবে হতাশার এমন চিত্রের মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন কেউ কেউ। এদেরই একজন ময়মনসিংহের রেজাউল করিম আসলাম। লোকঐতিহ্যের বাদ্যযন্ত্র সংরক্ষণ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে গান শোনার পুরনো দিনের রেডিও-গ্রামোফোনসহ অন্য মাধ্যমগুলোও আছে তার সংগ্রহে।
এসব সংগ্রহ নিয়ে আসলাম গড়ে তুলেছেন এক সংগ্রহশালা। নাম দিয়েছেন ‘এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম’। নগরীর টাউন হল মোড়সংলগ্ন ভাড়া বাড়িতে চলছে জাদুঘরটি। ২০২০ সালে এর যাত্রা শুরু।
এমন উদ্যোগের শুরু প্রসঙ্গে আসলাম জানালেন, তিন পুরুষ ধরেই বাদ্যযন্ত্র বিক্রির সঙ্গে জড়িত তাদের পরিবার। শহরের দুর্গাবাড়ি সড়কে রয়েছে ‘নবাব অ্যান্ড কোং’ নামের তার একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান। ১৯৪৪ সালে দাদা নবাব আলীর হাতে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা শুরু। দাদার পর বাবা জালাল উদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন।
আসলাম বললেন, ইংরেজ আমলে হারমোনিয়াম, বেহালা, গিটার, বিউগলসহ পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র দেশে এলেও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোর কদর লোকশিল্পীদের কাছে কখনোই কমেনি। আর লোকজ বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয় সহজপ্রাপ্য দ্রব্যাদি দিয়ে। লাউ, কুমড়োর খোল, মাটির হাঁড়ি, কলসি, চামড়া, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদিই লোকজ বাদ্যযন্ত্র তৈরির প্রধান উপাদান। তবে অন্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে অনেক ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। তবে তিনি চেষ্টা করছেন হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র ও গান শোনার মাধ্যমগুলো সংগ্রহ করতে।
এর মধ্যে তার লোকজসহ দেশি-বিদেশি বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ প্রায় ৬০০ ছাড়িয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে শুরু করেন। তার সংগ্রহে রয়েছে— কৃষ্ণকাঠি, চেম্পারেঙ, দভন্ডি, চিকারা, যোগী সারঙ্গী, মুগরবন, অ্যাকোর্ডিয়ান, ঘেরা, পেনাসহ লুপ্তপ্রায় ও বিলুপ্ত আরও বেশ কিছু যন্ত্র। কিছু কিছু বাদ্যযন্ত্র দুর্লভ, ২০০-৩০০ বছরের পুরনো।
এর বাইরে জলসাঘরের নানান জিনিসপত্রও আসলামের সংগ্রহে। এগুলো হলো— ফুলের সাজি, ফুলদানি, পানি সাকি, সুরাপাত্র, ঘণ্টা, নর্তকি মূর্তি, হুঁকো, তামাপাত্র, পানিপাত্র, মোমদানি, দেয়াল নকশি, খানদানি হুঁকো, পিকদানি, ছাইদানি জুতা, ছাইদানি প্লেট ও দুধপাত্র।
হারিয়ে যাচ্ছে যেসব, কারিগরদের দিয়ে ওইসব যন্ত্রের আদলে নতুন করে তৈরি করার কাজও করে যাচ্ছেন তিনি। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আসলামের সংগ্রহ একাধিকবার প্রদর্শিত হয়েছে।
এ ছাড়া আসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘নোভিস ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। ‘নোভিস আর্টিস্টিক এডুকেশন সেন্টার’ নামের একটি শিক্ষালয়ও পরিচালনা করেন তিনি। উপমহাদেশীয় ও পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে সংগীত, নৃত্য, চারুকলা, গিটার, বেহালা ও দোতারা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে।
রেজাউল করিম আসলাম বললেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণেই তরুণ প্রজন্মের শিল্পী এবং কলাকুশলীদের কাছে পুরনো দিনের বাদ্যযন্ত্রের কদর কমে গেছে। তার বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্য হলো— লোকসংস্কৃতিকে ধারণ করে রাখা এবং ডিজিটাল যুগে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অতীত জানানো। ‘এ সংগ্রহ ও জাদুঘর একদিন শুধু ময়মনসিংহের না, দেশ-বিদেশের গবেষকদেরও কাজে লাগবে।’
সংগ্রহ প্রসঙ্গে আসলাম বললেন, ‘অনেক অবিক্রীত বাদ্যযন্ত্র দোকানে রয়ে যেত। আবার বাদ্যযন্ত্র মেরামত করতে দিয়ে গেছেন; কিন্তু পরে অনেকেই ফেরত নিয়ে যাননি, যার বেশ কিছু বিশিষ্ট ওস্তাদ ও সংগীতকারদের। তারা এগুলো বিক্রি করেননি।’
গান শোনার যে মাধ্যমগুলো আছে যেমন— গ্রামোফোন, রেডিও, টার্নটেবল, টুইন ইন ওয়ান, থ্রি ইন ওয়ান, ক্যাসেট প্লেয়ার, সিডি প্লেয়ার, ভিসিআরও আছে তার সংগ্রহে। আছে গ্রামোফোন ২০টি, রেডিও ৮০টি ও গ্রামোফোন রেকর্ড প্রায় ৫ শতাধিক।
সংগ্রহশালায় দর্শনার্থীদের আসা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, শুক্র, সোম ও মঙ্গলবার সারা দিন খোলা থাকে। এ ছাড়া দূর থেকে অতিথি, দর্শনার্থী বা কোনো শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকার্যক্রমে এলে যেকোনো দিন, যেকোনো সময় খোলার ব্যবস্থা হয়।
প্রদর্শনী ছাড়াও আন্তর্জাতিক জাদুঘর, বিশ্ব সংগীত, আন্তর্জাতিক ভাষা, জাতীয় শিশু দিবসসহ বিভিন্ন দিবসে এখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আয়োজন করা হয় লোকউৎসব, শাস্ত্রীয় সংগীত উৎসব, বাউলউৎসব। নিয়মিতভাবে শ্রোতাদের জন্য থাকে মাসিক আয়োজন ‘শ্রোতব্য’, বাউলদের নিয়ে বসে মাসিক ‘বাউল বৈঠক’।
শাস্ত্রীয় সংগীত, নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, জালালগীতি, লোকসংগীত ও তবলা প্রশিক্ষণ কর্মশালাও নিয়মিত আয়োজন করা হয়।



