উদ্যোক্তার মৃত্যুতে ৪১ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ৩০০ কোটির হাসপাতাল

পাইকপাড়া ও ওয়ার্শী গ্রামে ১৬ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক স্থাপত্যের এক বিশাল অসমাপ্ত কঙ্কাল, ছবি: আগামীর সময়
ধূসর দেয়াল, ভাঙা জানালা আর চারদিকে ঘন জঙ্গল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো পরিত্যক্ত দুর্গ। অথচ এটি হওয়ার কথা ছিল হাজারো ক্যান্সার আক্তান্ত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল।
ঢাকার ধামরাই ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুর সীমান্তবর্তী পাইকপাড়া ও ওয়ার্শী গ্রামে ১৬ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক স্থাপত্যের এক বিশাল অসমাপ্ত কঙ্কাল। ৪১ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোরগোড়ায় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে শুরু হয়েছিল 'ইউনুস খান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল'-এর নির্মাণকাজ। কিন্তু ৩০০ কোটি টাকার এই স্বপ্নের প্রকল্প আজও আলোর মুখ দেখেনি।
হাসপাতালটির পেছনের গল্পটি বেশ আবেগঘন। স্থানীয়রা জানান, বিশিষ্ট শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবালের বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবাকে বাঁচাতে দেশ-বিদেশের বহু হাসপাতালে ছুটে বেড়াতে হয়েছিল তাকে। সেই বুকফাটা কষ্ট আর বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের একটি ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তোলার কাজ হাতে নিয়েছিলেন তিনি।
টানা ২০ বছর ধরে নিজের জমানো বিপুল অর্থ ঢেলেছেন এই প্রকল্পে। হাসপাতালের মূল ভবন, ডাক্তার ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক হোস্টেল, দৃষ্টিনন্দন মসজিদ ও পুকুরসহ অবকাঠামোর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষও হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা সংকটে মাঝপথে কাজের গতি ঝিমিয়ে পড়ে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে মূল স্বপ্নদ্রষ্টা শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবালের মৃত্যুর পর এই মেগা প্রজেক্ট পুরোপুরি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ধু ধু মাঠ আর বিশাল ভবনের বুক চিরে গজিয়ে উঠেছে ঘন জঙ্গল। দিনের আলোতেই সেখানে গা ছমছমে এক ভূতুড়ে পরিবেশ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোনো দেখভাল না থাকায় কোটি কোটি টাকার এই সম্পদ এখন স্থানীয় মাদকসেবীদের নিরাপদ আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। ভবন জুড়ে এখন বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের রাজত্ব। চোখের সামনে এমন একটি মহৎ উদ্যোগ ধ্বংস হতে দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
৩০০ কোটি টাকার এই হাসপাতালটি যদি সচল হতো, তবে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের লাখ লাখ রোগীকে আর ঢাকা গিয়ে ভিড় করতে হতো না। এই বিপুল বিনিয়োগ আজ মাটির নিচে ধুলো খাচ্ছে।
স্থানীয় সজীব নামে এক শিক্ষার্থী বললেন, ‘হাসপাতালটি চালু থাকলে আজ আমাদের অঞ্চলের মানুষকে ঢাকার যানজট ঠেলে রাস্তায় মরতে হতো না। ঘরের কাছেই মিলত আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা।’
ইকবাল আহমেদের ম্যানেজার মোর্শেদ চৌধুরীর ভাষ্য, ‘মূল উদ্যোক্তার মৃত্যুর পর কাজ থমকে গেলেও তাদের আশা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। মালিকপক্ষ এখনো জনগণের সেবায় হাসপাতালটি চালু করতে চায়। সরকার বা কোনো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান যদি এগিয়ে আসে, তবে যৌথ ব্যবস্থাপনায় এটি চালু করতে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।’
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন জানালেন, ‘যিনি কাজ শুরু করেছিলেন তিনি মারা যাওয়ার পর কাজটি থেমে যায়। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। হাসপাতালের মালিকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তাদের সম্মতি পেলে সরকারিভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব।’




