কিডস ক্লাব উপদেষ্টা পর্ষদের প্রথম বৈঠক
শিশুকে বুঝতে হলে তাদের ভাষাটা বুঝতে হবে

সিটিজেনস ব্যাংক ও আগামীর সময় কিডস ক্লাব-এর চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে শিল্পবাংলার শিশুকিশোরদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা- ছবি: ফাইল ফটো
কিডস ক্লাবের উপদেষ্টাদের প্রথম বৈঠক গত ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হলো। চলতি মাস থেকেই শুরু হবে নির্ধারিত মাসিক আয়োজন নিয়ে কিডস ক্লাবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। ছয় মাসের ছয়টি আয়োজনের টাইটেল স্পন্সর হিসেবে যুক্ত হয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক লিমিটেড।
কেমন হবে কিডস ক্লাবের কর্মকাণ্ড? এ বিষয়ে উপস্থিত উপদেষ্টারা তুলে ধরেছেন তাদের মতামত। সে মতামত নিয়েই আজকের এ আয়োজন।
আহসান হাবীব
এখনকার বাচ্চারা সায়েন্স থেকে সরে আসছে। এমনকি ফিজিকস, কেমিস্ট্রি তো কেউ পড়ে না। এখন থেকে যদি তাদের বিজ্ঞানমুখী করার চেষ্টা করি নানাভাবে, তাহলে এটা আমাদের হয়তো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। আর আমি যেহেতু ছবি আঁকি; আমার কাজ ছবি আঁকা, কমিকস আঁকা, এটার মধ্যে রিলেটেড। বাচ্চারা এটার সঙ্গে কিন্তু একটা বড় জাম্প দিচ্ছে। আমি একটা উদাহরণ দিই। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের ড্রয়িং ক্লাসে শিক্ষকরা আম, কলা, পেঁপে এগুলো আঁকতেন। সেটা দেখে দেখে তারপর বাচ্চারা দৃশ্য আঁকত। নদী, নৌকা যাচ্ছে, পালতোলা নৌকা, খেজুরগাছ এগুলো আঁকত। আমরা আরেকটু বড় হলাম; আরেকটা জেনারেশন, কয়েক জেনারেশন পর আমরা তখন স্থাপত্য আঁকতাম। শহীদ মিনার, সংসদ ভবন, স্মৃতিসৌধ, আমরা এগুলো আঁকতাম। কিন্তু এখনকার বাচ্চারা কমিকস আঁকতে চায়। তারা অন্য ড্রয়িং না, কমিকস আঁকে। এটা একটা বিরাট জাম্প। এটা আমি ফিল করি যে, খুব বড় একটা জাম্প আর কি। আমি এজন্য ভাবছি, আমাদের এমন কিছু কার্যক্রম নিতে হবে, যাতে বাচ্চারা নিজেদের একটু বড় ভেবে আঁকতে পারে। আমি এটাই ফিল করি।
মোস্তফা মামুন
কিডস ক্লাব আমরা করব— সবার আগেই আমরা চিন্তা করেছি। আমরা দেখছি কিডস ক্লাবের মতো এক ধরনের কার্যক্রম কিন্তু আছে। নানান জায়গায় কাজ করা হয়। যতই কাজ করা হোক, বাচ্চাদের জন্য কাজের আসলে কোনো শেষ নেই। সবারই যার যার জায়গা থেকে কিছু কিছু কাজ করা উচিত।
এই নগর বাস্তবতায় আমরা যেটা দেখতে পাই, বাচ্চাদের জন্য আসলে এখন খুব কঠিন সময়। যেমন আমরা আমাদের অফিসে ডে কেয়ার নেই বলে আমরা সাফার করি। আমরা দেখি আমাদের ফিমেল ওয়ার্কাররা (কর্মী) খুব কঠিন সময় পার করে। এই যে আজকে আমি দেখছিলাম যে একজন তার বাচ্চাকে নিয়ে এসেছে। দুজন (স্বামী-স্ত্রী) জব করে, কী করবে? এ বেবিটার (শিশুটার) জন্য অনেক কঠিন সময় না?
আবার বাস্তবতা হচ্ছে, কাজও করতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে পরিবার বা আমরা অনেক ক্ষেত্রে চাইলেও সময় দিতে পারি না। আমার ছেলের সঙ্গে আমার প্র্যাকটিক্যালি (বাস্তবে) সপ্তাহে একদিন দেখা হয়। আমি সকালে বের হয়ে যাই, রাতে আবার ফিরতে ফিরতে ১টা বেজে যায়, তখন সে ঘুমায়। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।
আমরা নানাভাবে অ্যাকটিভিটির (কার্যক্রমের) মাধ্যমে যদি তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের জায়গাটা তৈরি করতে পারি, যেটি অনেক প্রয়োজন, আমরা সেই জায়গা থেকে চিন্তা করলাম কিডস ক্লাবটা করার।
শিশুদের মধ্যে যদি আমরা ওই বোধটা ঢুকিয়ে দিতে পারি, সংস্কৃতি এবং মানবিক চিন্তা, তার সঙ্গে একটু ক্রিয়েটিভিটির জায়গায় স্পার্ক করা। তারা অনেক কিছু করতে চাইছে। সেগুলো যদি করা যায়, কিছু কিছু হলেও তো আমরা ভূমিকা রাখতে পারব। সেজন্যই আসলে আমাদের এই কিডস ক্লাবের চিন্তা এবং সেই কিডস ক্লাবের উপদেষ্টা হিসেবে যে আপনারা আমাদের সঙ্গে সাড়া দিয়েছেন, তার জন্য আমরা সত্যিই খুবই কৃতজ্ঞ।
মো. শাহ আলম
আপনারা শিষ্টাচারের কথা বলেছেন। আমি যদি আমার গুরুজনদের শিষ্টাচার করতে দেখি, আমি শিষ্টাচার করব। আমি যদি শিষ্টাচার করি, আমার অনুজরা শিষ্টাচার করবে, ছোটরা শিষ্টাচার করবে। কিন্তু শিষ্টাচার বিষয়টা সমাজ থেকে উঠে গেছে! এটাই বাস্তবতা। শিষ্টাচার কোথাও নেই। আমরা দেখি একটা ছোটখাটো মঞ্চের মধ্যে ১৫-২০ জন মানুষ ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দেন।
সিসিমপুর নিয়ে আমরা কাজ করতাম। সিসিমপুরে আমরা চেষ্টা করেছি বাচ্চাদের নানাভাবে বিকশিত করার জন্য। এ চেষ্টাটা তো একার না। চেষ্টাটা তো সার্বিকভাবে সব দিক থেকে সবাই একটু একটু করে কন্ট্রিবিউট করার পর একটা বড় কিছু হয়। কিন্তু এখন সেগুলো আস্তে আস্তে সীমিত হচ্ছে। কোনো কাজ হচ্ছে না। শিশু সংগঠনগুলো নেই।
যেহেতু আমি নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, আমি যে জিনিসটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, প্রথমে শিশুদের শিষ্টাচার, তারপর তাদের সৃজনশীলতা। এগুলো যদি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে না নেওয়া যায়, তাহলে হবে না। বাচ্চাদের নানা ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। বাচ্চাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ করার চেষ্টাটা থাকতে হবে। আমি নিজেকে প্রকাশ করছি। নিজেকে প্রকাশ করার তো দুটি মাধ্যমই আছে— একটা হলো নাচ, গান; আরেকটা লেখালেখি করা।
বাদল সৈয়দ
আমাকে যখনই কেউ জিজ্ঞেস করেন, আপনার বয়স কত? আমি বলি আমার মেয়ের বয়স যত, আমার বয়স তত। আমার মেয়ের বয়স ২১, আমার বয়স ২১। সে যখন পাঁচ বছর ছিল, আমি তখন পাঁচ বছরের শিশু ছিলাম। কারণ পাঁচ বছরের শিশু না হয়ে তাকে বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সে যখন ১৩ বছরে পা দিল, আমি ১৩ বছরের কিশোর হয়ে গেলাম। কারণ ১৩ বছরের কিশোর হওয়া ছাড়া ১৩ বছরের চরিত্র বোঝা সম্ভব নয়। সে যখন ১৮ বছর হলো, তখন আমি ১৮ বছরের তরুণ হলাম। নয়তো তার তারুণ্যের ভাষা আমি বুঝতে পারব না।
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, শিশুকে বুঝতে হলে তাদের ভাষাটা বুঝতে হবে।
মোস্তাক শরীফ
একটা বিশাল জনগোষ্ঠী মাদ্রাসায় বড় হচ্ছে। মাদ্রাসার শিশুদের কিডস ক্লাবে যুক্ত করার অনুরোধ করব। শুধু সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুদের কথা ভাবলে হবে না। লাখ লাখ পথশিশুর কথাও ভাবতে হবে। এখনকার শিশুরা পাখি চেনে না। ফুল চেনে না, গাছ চেনে না, পশু চেনে না। কাজেই ও যাতে ন্যাচার স্মার্ট হয়। প্রকৃতির সচেতনতার বিষয়টা এখানে বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা উচিত। ওদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া এবং ওরা গাছ চিনবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের শিশুরা হয়তো কেউ নাম্বার স্মার্ট, কেউ সংখ্যা ভালো বোঝে, কেউ বডি স্মার্ট, কার্যক্রমের মাধ্যমে ভালো বোঝে, করতে পারে। কেউ পিকচার স্মার্ট, কেউ মিউজিক স্মার্ট, কেউ ওয়ার্ড স্মার্ট, কেউ সেলফ স্মার্ট, একটু ইন্ট্রোভার্ট, আবার কেউ পিপল স্মার্ট, সে এক্সট্রোভার্ট। তার মানে এসব ইন্টেলিজেন্সকে ঘিরেই আমাদের কর্মকাণ্ড করা উচিত।
আজহার ফরহাদ
আমি মনে করি, আমরা এতই ব্যস্ত যে, আমাদের বাংলাদেশে এত শিশু থাকার পরও তাদের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। যদি দেশের বাইরে হতো; আজকে যদি সুইডেনে একটা বাচ্চাদের বই বের হয়, সেটার জন্য সরকারিভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুষ্ঠান হয়, বইয়ের প্রকাশনা উৎসব হয়। আজকে বাংলাদেশে এত শিশুদের বই বের হচ্ছে, একটা বই হাতে নেওয়ার মতো না, কারণ শিশুদের সঙ্গে বইয়ের কোনো কানেকটিভিটি নেই।
আমার যে বাচ্চাটা আমার ঘরে থাকে, সে বাচ্চাটাকে আমি কি সময় দিচ্ছি? আমি তো সময় দিতে পারছি না। এ উপেক্ষা থেকে একটা বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
নিশাত সুলতানা পূরবী
আমার মনে হয় কিশোর বয়সটাকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কিশোর গ্যাংয়ের যে কালচারটা দেখছি, সেখান থেকে তাদের সরিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে কাজ করা প্রয়োজন। সেটা একটা দাবি থাকবে। আমার কাছে মনে হয় এখন যে সময়টা এসেছে, সেক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলোকেও কীভাবে আমরা সম্পৃক্ত করতে পারি সেটাও ভাবা দরকার। বাংলাদেশে কিন্তু এখন ৬৫ হাজারের মতো মাদ্রাসা আছে।
বাবা-মাকে যুক্ত করার বিষয়টা খুবই ভালো। আমার মনে হয় প্রতিদিনের সংবাদপত্রের একটা অংশ হিসেবে যদি শিশুদের জন্য একটা সেকশন আমরা তৈরি করতে পারতাম, তাহলে কিন্তু তাদের প্রথম নিউজ রিডিংয়ের যে হ্যাবিটটা, সেটা তৈরি হয়। বাবা-মার জন্য খুব সহজ হয় যে তার সন্তানের হাতে প্রতিদিনের দেশের এবং আন্তর্জাতিক খবরগুলো আসছে।
সুমনা বিশ্বাস
আমরা প্রথমেই বলছি, বই পড়া স্বপ্ন আঁকা। বই পড়ার সংস্কৃতি থাকতে হয় তো বাড়িতে। আমাদের সব বাড়ি থেকে বই পড়ার সংস্কৃতি চলে গেছে। শিশুরা পড়বে কোত্থেকে? আমরা পড়ছি? আমরা ছোটবেলায় আমাদের দাদিকে দেখতাম বই পড়তে। এখন আমাদের শিশুদের সেই সংস্কৃতি দিতে পারছি না। আমি এখন নিউজ পড়ছি অনলাইনে। আমার বাড়িতে যখন আমি ফিরছি, আমার ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমার যে সময়টা কাটছে, সেই অংশে পড়ার ব্যাপারটা নেই। ফলে আমি মনে করি বাড়ি থেকে বই পড়ার সংস্কৃতি উঠে গেছে, সেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা। সেখানে ফিরতে না পারলে শিশুরা বই পড়বে না।
রূপশ্রী চক্রবর্তী
এক ধরনের শিশু আছে যারা অনেক বেশি ডিভাইসে অভ্যস্ত, সে জানে যে সে কথা বলার চেয়ে শুনবে বেশি। পর্দার ওইপাশে কথা আসবে, সে শুনবে, সে সেটাকে ধারণ করবে। তার নিজের কিন্তু কথা বলার সাথী নেই এবং সে যখন কোনো একটা ক্লাসে যায় বা কোথাও যায়, সে কিন্তু কথা বলে না। ভাষা হচ্ছে মানুষের যোগাযোগের অন্যতম একটা মাধ্যম; কিন্তু সেই মাধ্যমের যথাযথ ব্যবহার থেকে সে বঞ্চিত হচ্ছে। যে শিশুরা কথা বলে না, ডিভাইস আসক্তি রয়েছে, ডিভাইসের ব্যবহারটাকে আমরা তার উপযোগী করে আনতে পারি কি না— সে জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে।
মো. জাহিদ আলমগীর
এটা একটা বড় সুযোগ আমাদের। এক প্ল্যাটফর্মে কাজ করা এবং এরকম একটা জায়গায় আমরা যাতে সংশ্লিষ্ট হতে পারি। আমি আমার বোর্ডের সঙ্গে, টপ ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বললাম। খুবই প্লিজড এবং বললেন যে কেন নয়। বিশেষ করে দেশে যে যে করপোরেট সেক্টর আছে কিংবা যারা কাজ করছেন মাল্টিন্যাশনাল, তাদের তো আসলে এ ধরনের কাজ করার স্কোপ কম। যদিওবা তাদেরই আসলে এগিয়ে আসাটা উচিত সবার আগে। আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা মনে করি কিডস ক্লাব অনেক দূর যাবে এবং আমাদের সহযোগিতা সবসময়ই থাকবে।
দন্ত্যস রওশন
শিশুদের প্রতি আমাদের নজর নেই। শিশুরা অবহেলার শিকার। অবহেলিত হচ্ছে সে; পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবেও। রাষ্ট্রীয়ভাবেও শিশুদের জন্য বড় কোনো উদ্যোগ নেই।
শিশুরা আসক্ত হচ্ছে ডিভাইসে। তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং। বাস্তবতা সুনাগরিক তৈরির ক্ষেত্র অনুকূল নয়। এ পরিস্থিতিতে যাত্রা শুরু করছে কিডস ক্লাব। এ পাহাড়সমান দায়িত্ব একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। আমরা মনে করি, এ উদ্যোগের পাশে আরও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে। শিশুরা ছোট, কিন্তু এ দায়িত্বকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। শিশুদের প্রতি দায়িত্ব বড় করে দেখলে জাতি বড় হয়ে উঠবে।