জঙ্গল সলিমপুর
যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন

সন্ত্রাসী হামলায় লণ্ডভণ্ড যৌথবাহিনীর ক্যাম্প। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নতুন করে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সন্ত্রাসীদের হামলায় একটি নবনির্মিত ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা কেটে ব্যারিকেড তৈরি এবং গোলাগুলির ঘটনার পরও হতাহতের খবর না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক।
গত রবিবার রাত ১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথবাহিনীর জন্য নির্মিত একটি ক্যাম্পে হামলা চালায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। একই সময়ে আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত আরেকটি অস্থায়ী ক্যাম্পেও হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই ক্যাম্পটি আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বোধনের কথা ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, হামলার আগে সন্ত্রাসীরা এক্সকাভেটর ব্যবহার করে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথ থেকে আলীনগর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের চার স্থানে মাটি কেটে তৈরি করে ব্যারিকেড। এতে ভেতরের ক্যাম্পগুলো কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তিন দিক থেকে প্রায় ৩০০ সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাম্প ঘিরে হামলা চালায়।
র্যাব-৭–এর অধিনায়ক হাফিজুর রহমানের দাবি, প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে উভয়পক্ষে গোলাগুলি চলে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, ১০৫ রাউন্ড গুলি ছুঁড়েছে পুলিশ।
তবে ঘটনাটি ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এক্সকাভেটর দিয়ে চারটি স্থানে রাস্তা কাটতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং যন্ত্রের শব্দও অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায়। অথচ মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের ক্যাম্পে অবস্থানরত পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা কিছু বুঝতে পারেননি বলে করা হয়েছে দাবি। আবার ভারী অস্ত্র ব্যবহার ও দীর্ঘ সময় গোলাগুলির পরও কেউ আহত না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন অপরাধবিষয়ক সাংবাদিকরা।
ঘটনার পর দায়ের হওয়া মামলার এজাহারেও হামলার আগে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সোহেল রানা মামলায় উল্লেখ করেন, রাত পৌনে ১২টার দিকে তিনি খবর পান যে দুটি ক্যাম্পে হামলার প্রস্তুতি চলছে। পরে ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কাটা ও ব্যারিকেড দেখতে পান। রাত সাড়ে ১২টার দিকে আলীনগর বাজার এলাকায় পৌঁছে তিনি দেখেন, সন্ত্রাসীরা কালভার্ট ভাঙছে। পুলিশ এগিয়ে গেলে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে আলীনগর বিদ্যালয় ক্যাম্পের কাছে গিয়ে দেখা যায়, সন্ত্রাসীরা এক্সকাভেটর দিয়ে সীমানা প্রাচীর ভাঙছে।
মামলায় তিনটি এক্সকাভেটর ও তিনটি ড্রাম ট্রাক জব্দ করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব যান ব্যবহার করেই সরকারি সম্পদ ধ্বংস ও পাহাড় কাটাসহ অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হতো।
মামলার দাবি অনুযায়ী সন্ত্রাসীরা দুই ঘন্টারও বেশিসময় ধরে রাস্তা কেটে রাখার কাজ করেছে। কিন্তু বাইরে থেকে অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিরোধ করল না কেন, এই প্রশ্ন ছিল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের কাছে।
উত্তরে তিনি বলেন, ‘পুলিশ যখনই অবগত হয়েছে, তখনই গেছে। শুরুতে থানার পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন পরিবেশের সুযোগ নিয়েছে সন্ত্রাসীরা।’
গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাব কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, ‘পাহাড়ের সরু রাস্তা দিয়ে এক্সকাভেটর এনে রাস্তা কেটে এক ঘণ্টার মধ্যে হামলা শেষ করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেছে।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জুনায়েত কাউছার দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ছিল বলেই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তার ভাষ্য, ‘আমরা যেদিন থেকে জঙ্গল সলিমপুরে ক্যাম্প করেছি, সেদিন থেকেই সন্ত্রাসীদের মোকাবিলার পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। প্রস্তুতি ছিল বলেই ১০৫ রাউন্ড গুলি ছুড়ে তাদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি।’
তবে হামলার আগের দিন থেকেই সন্ত্রাসীদের হুমকির তথ্য সামনে এসেছে। ক্যাম্প নির্মাণে নিয়োজিত শ্রমিক ও এপিবিএনের এক সদস্য জানিয়েছেন, ক্যাম্পের সামনে এসে ভিডিও ধারণ করে এবং হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার রাতেও কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে অবস্থান নিতে দেখা যায় আলীনগর বাজারে।
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিদস্যু ও অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৩১০০ একর পাহাড়ি এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবেও পরিচিত। এলাকাটির নিয়ন্ত্রণে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে ভূমিদস্যু মোহাম্মদ ইয়াসিনের বিরুদ্ধে।
গত ১৯ জানুয়ারি ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার অভিযানে গিয়ে র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এরপর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মিলে যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
এদিকে হামলার পরও নির্ধারিত সময়েই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে যাবেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। তার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপিরও থাকার কথা রয়েছে।










