কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারের পকেটে ২১৭ কোটি
- ১১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রেডিও ডিভাইস কারখানা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাজ শুরুর কোনো খবর নেই, অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে ২১৭ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকিং চ্যানেলে এ টাকা পাঠানো হয়েছে বিদেশের অ্যাকাউন্টে। বাকি অর্থ ছয় কিস্তিতে এলসির বিপরীতে পরিশোধের কথা আছে। এমন শর্তযুক্ত এক চুক্তির আওতায় ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রেডিও ডিভাইস উৎপাদন কারখানা স্থাপন কাজের প্রথম কিস্তি হিসেবে এ অর্থ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বিপুল এ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হলেও এখানে উৎপাদিত প্রতিটি রেডিও ডিভাইসের দাম কত পড়বে, সেটাই উল্লেখ নেই প্রস্তাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রকাশিত (নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট-এনডিএ) ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’র আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাজ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এল থ্রি হ্যারিস। প্রতিষ্ঠানটির দেশীয় প্রতিনিধি অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল।
যে কাজের জন্য অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, সেই কাজের একেকটি ‘বিশেষ’ টেবিলের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। ৮১০ বর্গফুট জায়গায় মূল কারখানা স্থাপনের কাজে জনবল সাতজন। কিন্তু বিদেশে প্রশিক্ষণ নেবেন আটজন। সেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এই কারখানায় তৈরি করা হবে কয়েক ধরনের রেডিও ডিভাইস। তা কিনে ব্যবহার করবে নিরাপত্তা বাহিনী। আগামীর সময়ের অনুসন্ধান ও প্রকল্প প্রস্তাবনার নথি ঘেঁটে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
প্রকল্প প্রস্তাবে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রযুক্তি স্থানান্তর (টিওটি) চুক্তির আওতায় কারখানা স্থাপন করলে সবসময় প্রযুক্তি পণ্যের নকশা, সোর্স কোড, কাঠামোগত নকশা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কিছুই পাওয়া যাবে না, যা বিস্ময়কর। এল থ্রি হ্যারিস যত দেশে টিওটির আওতায় এ ধরনের কারখানা স্থাপন করেছে, কোথাও সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তি স্থানান্তর করেনি। বিশেষজ্ঞ দলটির মতে, এ প্রকল্পের চুক্তির ১২টি মূল অনুষঙ্গের মধ্যে ৭টি উচ্চ ও বাকিগুলো মাঝারি ঝুঁকিসম্পন্ন। একটিও দেশের জন্য লাভজনক নয়। মূলত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ লোপাট ও এলসির আড়ালে তা পাচারের শঙ্কা রয়েছে।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারি প্রকল্পে ঠিকাদারকে অগ্রিম অর্থ পরিশোধের কোনো নজির নেই। এমন নজির অন্য কোনো দেশে আছে বলেও আমি মনে করি না। যদি ২১৭ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধের কথা চুক্তিতে বলাও থাকে, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। সাধারণত ঠিকাদার, ভেন্ডর বা সরবরাহকারী চুক্তি মোতাবেক কাজ করতে না পারলে তার কাছ থেকে আর্নেস্ট মানি কেটে নেওয়ার শর্ত থাকে। এখানে উল্টোটা হয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত দেশীয় বা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় নেই। এ বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা অপরিহার্য। কারণ এগুলো জনগণের অর্থ। এখানে অনিয়ম হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট মনে হচ্ছে।’
জানা গেছে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসেপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক একটি চুক্তির আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধরনের রেডিও ডিভাইস (অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম) তৈরির কারখানা স্থাপন করা হবে। ঢাকার একটি সংরক্ষিত এলাকায় ৩ হাজার ৮২৪ বর্গফুট আয়তনের অবকাঠামোর ওপর এ-সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মূল কার্যক্রমের জন্য ররাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৮১০ বর্গফুট জায়গা। এখানেই উৎপাদন করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের এল থ্রি হ্যারিস সিরিজের রেডিও ডিভাইস। উৎপাদন কাজে সেখানে স্থাপন করা হবে আটটি ‘বিশেষ’ টেবিল। যার দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিটি টেবিলের দাম প্রায় ৬ কোটি। এ ছাড়া একটি নেটওয়ার্ক র্যাক সিস্টেমের দামও ধরা হয়েছে ৬ কোটি। ছয় বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের জনবল মাত্র সাতজন। বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নেওয়া এ প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া, আর্থিক অসংগতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত নথির তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এল থ্রি হ্যারিস থেকে ভিএইচএফ ও এইচএফ রেডিও ডিভাইস কিনতে ১ হাজার ১১৭ কোটি ২৫ লাখ ২৬৫ টাকার প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ক্ষেত্রে সাধারণত সময়সীমা নির্ধারিত থাকে ৪৮ দিন। কিন্তু এ দরপত্রের প্রক্রিয়া ২০২৫ সালের ৪ থেকে ৩১ মার্চের (২৮ দিন) মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ঈদের ছুটিও ছিল। বিষয়টি জানাজানির পর এ-সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্পের অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাস্তবতা এবং স্থানীয় অংশীজন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এ খাতের বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, প্রকল্পটি প্রযুক্তি হস্তান্তরের (টিওটি) উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কতটুকু প্রযুক্তি বাংলাদেশে স্থানান্তর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের আওতায় মূল প্রযুক্তি বা সোর্স কোড নয়, বরং বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ দেশে এনে জোড়া লাগানো হবে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ছয় ক্যাটাগরির চার হাজার রেডিও ডিভাইস অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৪ থেকে ৩১ মার্চ বেলা ১১টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত দরপত্র বেচাকেনা হয়। শেষ দিন সাড়ে ১১টায় খোলা হয় দরপত্র। কাজ পায় অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এল থ্রি হ্যারিসের দেশীয় প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এল থ্রি হ্যারিসের জমা দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ীই মূলত সবকিছু চূড়ান্ত করে দ্রুতগতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘অদ্ভুত’ চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম ২১৭ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৭ টাকা দেওয়া হয়েছে। গত ২৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের এলসি শাখা থেকে এই অর্থ এল থ্রি হ্যারিসের নিউ ইয়র্ক সিটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে (নম্বর-৩০৫...২০৮) পাঠানো হয়। বাকি অর্থ আরও ছয় কিস্তিতে ২০৩২ সালের মধ্যে পরিশোধের কথা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির দেশীয় প্রতিনিধি অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন মুরাদ। তবে এ প্রতিষ্ঠানটি মূলত পরিচালনা করেন সিইও মনজুর হোসেন জিম্মু এবং তার স্ত্রী আসমা-উল হুসনা অ্যানি (পরিচালক)। সিইও মনজুর হোসেন জিম্মুর সঙ্গে সম্প্রতি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কথা বলতে চাননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন মুরাদ মোবাইল ফোনে আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটার কন্ট্রাক্ট হয়ে গেছে। কাজ এগোচ্ছে।’ চুক্তির প্রথম কিস্তির ২১৭ কোটি টাকা পরিশোধ হয়েছে কি না— এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘আমি তো বাইরে ছিলাম, এটা বলতে পারছি না।’ এ প্রকল্পে দেশের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে এটা জানেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এটা ভুল কথা। এখানে চায়নার মাল দেওয়া হচ্ছে না। বিশ্বের নাম্বার ওয়ান কোম্পানি হ্যারিস থেকে মাল কেনা হচ্ছে।’ যে ডিভাইস তৈরি করা হবে প্রস্তাবে তার দামই উল্লেখ নেই, তা ছাড়া একটি টেবিলের দাম ৬ কোটি টাকা হয় কীভাবে— এমন প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘তাদের (এল থ্রি হ্যারিস) কাছে নিশ্চয়ই কোনো উত্তর আছে। আমি পুরো প্রকল্প প্রস্তাব পড়ে দেখিনি। তাই সবকিছু আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে যারা মালামাল বুঝে নেবেন তাদের সাফ বলে দিয়েছি, আপনারা ন্যায্য পয়সা দেবেন আর এরা (হ্যারিস) মাল দেবে। আপনারা ১০০ ভাগ বুঝে নেবেন।’
জানা গেছে, গত ২১ মে একটি পর্যালোচনা নথিতে প্রকল্পের অর্থায়ন ও অনুমোদন জটিলতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়, ‘২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ১১৭ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৬৫ টাকা ব্যয়ে দ্রব্যটি (এল থ্রি হ্যারিস সিরিজের রেডিও ডিভাইস) ক্রয়ের অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদন/আর্থিক সম্মতিপত্রে সংশ্লিষ্ট বাজেট খাতে ৮৪৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। এ ছাড়া ক্রয় প্রস্তাবে একাধিক অর্থবছরের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন গ্রহণ প্রয়োজন।’
সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া এল থ্রি হ্যারিসের ১০০ পৃষ্ঠার প্রকল্প প্রস্তাব প্রায় এক মাস আগে এ প্রতিবেদকের হাতে আসে। সেটা যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেয় আগামীর সময়। এ খাতের বিশেষজ্ঞ একটি দল এক সপ্তাহ ধরে প্রস্তাবটি বিশ্লেষণ করে একটি লিখিত মতামত দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, চুক্তি সইয়ের এক মাসের মধ্যে কোনো কাজ না করেই ২১৭ কোটি টাকার বেশি পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। কাজ শুরুর আগে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ অগ্রিম দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। চুক্তি অনুযায়ী এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এল থ্রি হ্যারিসের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির সম্মুখীন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞ মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে, উৎপাদন কারখানার ওয়ারেন্টি মাত্র এক বছরের। অথচ প্রকল্পের মেয়াদ ছয় বছর। এ সময়ের মধ্যে কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতসহ অন্যান্য সাপোর্টের কোনো নির্দেশনা পরিকল্পনায় নেই। এ ধরনের প্রকল্পে অন্তত তিন বছরের ওয়ারেন্টি ও পাঁচ বছরের সাপোর্ট প্যাকেজ অত্যন্ত জরুরি। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রেডিও ডিভাইস কেনার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় ও ২০ শতাংশ বিনিয়োগ (আরওআই) আসার কথা বলা হলেও তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এ ছাড়া প্রস্তাবে পূর্ণাঙ্গ একটি রেডিও ডিভাইসের দাম কত হবে, সেটি বলা নেই। ডিভাইস তৈরি করতে যে যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হবে, সেগুলোর বাজারদর যাচাই বা নিশ্চিত হওয়ারও কোনো উপায় নেই। এমনকি কারখানা তৈরি ও ভবিষ্যৎ আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাবও নেই।
বিশেষজ্ঞ দলের অভিমত, এল থ্রি হ্যারিস ছাড়াও ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক নামি কোম্পানি এ ধরনের কাজ করে থাকে এল থ্রি হ্যারিসের দেওয়া দরের চেয়ে অনেক কমে।




