দেশে অপুষ্টির শিকার দেড় কোটি মানুষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির শিকার। মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ৪ কোটি ৫৪ লাখ মানুষ। অপুষ্টির এই বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান নারী ও শিশুর ওপর। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ নারী ভুগছেন রক্তস্বল্পতায়। অপুষ্টির কারণে বয়সের তুলনায় দেশের ৪২ লাখ শিশুর উচ্চতা কম বা খর্বকায়।
এসব তথ্য উঠে এসেছে জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। ২১ জুলাই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সম্মিলিত প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। সেখানে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্ব জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ক্ষুধার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সে হিসেবে বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৪৪ লাখ মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৪৩ লাখ অপুষ্টির শিকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৫ সময়কালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে বাস করেছিলেন। এর মধ্যে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার শিকার। যার অর্থ হলো ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বছরের কোনো না কোনো সময় খাদ্যহীন অবস্থায় থাকেন। অর্থাৎ তাদের কাছে খাওয়ার মতো কিছুই থাকে না।
ক্ষুধার হার বা অপুষ্টির ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। শ্রীলঙ্কা (৪ দশমিক ৯ শতাংশ), নেপাল (৫ দশমিক ২ শতাংশ), ইরান (৬ দশমিক ৭ শতাংশ) বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে ভারত (৯ দশমিক ৮ শতাংশ), পাকিস্তান (১৬ দশমিক ১ শতাংশ ) ও আফগানিস্তান (২৭ দশমিক ৮ শতাংশ) বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে।
দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে উচ্চতা অনুযায়ী ওজনের হার কমেছে। অবশ্য তা বৈশ্বিক হার ২৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে পিছিয়ে। ২০১২ সালে এই বাংলাদেশে এই হার ছিল ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ যা ২০২৪ সালে কমে ২৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। তবে এখনো ৪২ লাখ শিশু এই সমস্যার শিকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বা ১৭ লাখ শিশু উচ্চতার তুলনায় কম ওজনে (কৃশতা) ভুগছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের (১৩ দশমিক ৬) তুলনায় কিছুটা কম হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। পুষ্টিবিদরা বলছেন, শৈশবে সঠিক পুষ্টির এই অভাব শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত করে, যা পরবর্তী জীবনে তাদের কর্মক্ষমতা ও মেধার বিকাশ কমিয়ে দেয়।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতি দেখা গেছে। ২০১২ সালে ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ নারী অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় ভুগছিলেন, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ নারী এই সমস্যায় আক্রান্ত।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনটির বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানতে সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল; কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে বক্তব্যের জন্য পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির সঙ্গে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি তিনিও।
অপুষ্টির মূল কারণ: প্রতিবেদনে অপুষ্টির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পুষ্টিকর খাবারের আকাশছোঁয়া দামকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এক ব্যক্তির প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যের খরচ ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ পিপিপি ডলার (পিপিপি আন্তর্জাতিক মুদ্রার একক)। ২০২৫ সালে ন্যূনতম ব্যয় দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৫৯ পিপিপি ডলার। এই উচ্চমূল্যের কারণে দেশের ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার আর্থিক সামর্থ্য হারিয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গড় ব্যয় ৪ দশমিক ১৮ পিপিপি ডলার। যেখানে বাংলাদেশের এই ব্যয় ৪ দশমিক ৫৯ পিপিপি ডলার। অর্থাৎ এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে পুষ্টিকর খাবারের খরচ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর খাবারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই খরচ হয় প্রাণিজ আমিষ, ফলমূল এবং শাকসবজি কিনতে। কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েনে মানুষ এসব খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের শরীরের ওপর। ব্যয় মেটাতে না পেরে বিপুল মানুষ আমিষ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবারের বদলে সস্তা চাল বা ভাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের মাত্র ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু (৬-২৩ মাস) এবং ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী ন্যূনতম বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার পান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো অধিকাংশ মানুষের থালায় পর্যাপ্ত পুষ্টিকর উপাদান থাকে না। খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাপী ও অভ্যন্তরীণভাবে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এ ছাড়া জ্বালানি মূল্যের প্রভাব, বৈশ্বিক সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্যনিরাপত্তার স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে।
বাংলাদেশে সরকারি ভর্তুকি ও গবেষণা এখনো প্রধানত চাল, গমের মতো দানাজাতীয় ফসলে সীমাবদ্ধ। পুষ্টিকর খাবার যেমন ডাল, ফল বা সবজির উৎপাদনে বিনিয়োগ অনেক কম যা পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিশেষজ্ঞের মত: জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাইদুল আরেফিনের সঙ্গে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের পুষ্টিবিষয়ক পরিস্থিতি পাঁচ বছর ধরে একই রকম আছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, উপকূল, পাহাড়ি অঞ্চল সর্বোপরি আমাদের পুষ্টিকর খাবারের তালিকা ভালো না।’
খাদ্যনিরাপত্তা বাড়াতে হলে সরকারকে অনেক কিছু করতে হবে জানিয়ে তিনি বললেন, ‘প্রথমত, আমরা যেহেতু কৃষিপ্রধান দেশ, কৃষির ওপর আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়, মানুষ যাতে পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেন, সেজন্য ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর যারা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তাদের সারা বছর ধরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে।’




