চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ
অপরাধী ধরতে ‘অন্ধকারে ঢিল’
- অপরাধীদের হালনাগাদ তালিকা নেই পুলিশের হাতে
- ওপর মহলের নির্দেশেই চলে অভিযান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম মহানগরীতে অনেকটা ‘অন্ধকারে ঢিল ছুড়ে’ অপরাধ দমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। দুই বছর আগে করা কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা আর হালনাগাদ হয়নি। অথচ কিশোর অপরাধীদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক বা গডফাদার পাল্টে গেছে। ছিনতাইকারী, চোর, ডাকাত, পেশাদার অপরাধীদেরও আলাদা কিংবা সমন্বিত কোনো তালিকা পুলিশের হাতে নেই এ মুহূর্তে। এ অবস্থায় নগর পুলিশের অপরাধ দমন অনেকটাই ঘটনা ও মামলানির্ভর বা সাময়িক অভিযানকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাছে যেসব তালিকা রয়েছে, সেগুলো বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তখনকার বাস্তবতায় তৈরি করা। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেগুলো কতটা কার্যকর, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সমন্বিত ডেটাবেজ ও স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকায় স্থায়ীভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে। ৭০ লাখ মানুষের এ শহরে অপরাধের প্রকৃতি ও অপরাধীর আচরণ অন্য শহরের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। গতানুগতিক পদ্ধতিতে ‘চোর-পুলিশ খেলা খেলে’ চট্টগ্রাম শহরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়।
সিএমপি সদর দপ্তরের একজন উপকমিশনার বললেন, ‘কিশোর অপরাধী, ছিনতাইকারী, চোর-ডাকাতদের বিষয়ে কোনো জরিপ বা নতুন করে কোনো তালিকা প্রণয়ন গত দুই বছরে করা হয়নি। আগের তালিকা আছে। সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের ঘটনায় থানায় মামলা করা হলে আমরা আসামিদের নামগুলো আগের তালিকার সঙ্গে যুক্ত করে রাখছি।’
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘অপরাধীদের নাম, তথ্য-উপাত্ত সাধারণত সংগ্রহ করেন থানা ও ফাঁড়ির ইনচার্জরা। এরপর গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে তা যাচাই-বাছাই করে একটা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে পুলিশে অনেক রদবদল হচ্ছে। একজন ওসি থানায় বসে লোকজন চিনতেও তো দুই-তিন মাস সময় লাগে। দেখা যাচ্ছে, এর আগেই ওসি বদলি হয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ করা সম্ভব হয়নি। তবে ওসিদের নির্দেশনা দেওয়া আছে, তারা যেন এলাকাভিত্তিক তালিকা করে অভিযান জোরদার করেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে চট্টগ্রাম নগরীতে অপরাধের হার বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুন, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র উদ্ধার, রাজনৈতিক হাঙ্গামা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে নগরীর ১৬ থানায় ২ হাজার ৯৬৩টি মামলা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের একই সময়ে মামলা করা হয় ২ হাজার ৬৯২টি। যদিও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতিশীল পরিস্থিতিতে অনেক অপরাধের ঘটনায় পুলিশকে সে সময় দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এরপর ২০২৬ সালে, অর্থাৎ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে মামলা করা হয়েছে ৩ হাজার ৯২টি। এর মধ্যে ডাকাতি-ছিনতাইয়ের মামলা প্রায় ৩০০।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর নগরীর খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় দুই কিশোর গ্যাং সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার গ্রুপের বিরোধে মোহাম্মদ হৃদয় নামে ১৬ বছর বয়সী এক ছেলে খুন হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছিলেন, সেভেন স্টার গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগা। আর ফাইভ স্টার গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন খুলশী থানা যুবদলের নেতা হেলাল। অথচ সিএমপির কাছে কিশোর গ্যাংয়ের যে তালিকা রয়েছে, তাতে নিয়ন্ত্রক হিসেবে ওয়াকিল কিংবা হেলাল কারও নাম নেই।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে ‘মাদক কারবারের আধিপত্য বিস্তার’ নিয়ে স্থানীয় মুরাদ ও জসিম বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মুরাদ নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের নেতা ও নগর কমিটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলছিলেন, ‘মুরাদ ও জসিম আগে একই গ্রুপে ছিলেন। তখন তারা মাদকের কারবার করতেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার পর তারাও পরিচয় পাল্টে এখন সরকারি দলের পরিচয় দেন। এখন তারা আলাদা হয়ে গেছেন। মাদকের কারবার করেন। আর সেই কারবারের আধিপত্য বজায় রাখতে মুরাদ ও জসিম উভয়ে এখন দুটি কিশোর গ্যাং পরিচালনা করেন।’
অন্তত ১০ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বেশ কয়েকজন নেতার ছত্রচ্ছায়ায় চট্টগ্রাম নগরীতে কিশোর অপরাধী চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অন্তত ৩৯টি খুনের ঘটনা রেকর্ড হয় নগরীর বিভিন্ন থানায়। এ অবস্থায় ২০২৪ সালের মে মাসে ২০০ কিশোর গ্যাংয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ অপরাধী ও তাদের ৬৪ গডফাদারের নাম, রাজনৈতিক পরিচয় ও আমলনামাসহ তালিকা করে নগর পুলিশ। গডফাদারদের মধ্যে চসিক কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু, জহুরুল আলম জসিম এবং আওয়ামী লীগ-যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, আব্দুর রউফ, সাইফুল আলম লিমন, রিটু দাশ বাবলুসহ আরও কয়েকজনের নাম ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তালিকাভুক্ত গডফাদারদের অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। কেউ কেউ আত্মগোপনে। নগর পুলিশের কর্মকর্তারা বলছিলেন, কিশোর গ্যাংগুলো এখনো সক্রিয় রয়ে গেছে। বরং কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্যপ্রবণ স্পটের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। আর তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম নগরীতে ৬০৩ ছিনতাইকারীর একটি তালিকা তৈরি করেছিল সিএমপির গোয়েন্দা শাখা। তিন ক্যাটাগরিতে করা এ তালিকায় সক্রিয় ছিনতাইকারী ৪৭৩, জেলহাজতে রয়েছে ৪১ এবং নিষ্ক্রিয় হিসেবে ৪৩ জনের নাম উল্লেখ ছিল। নগরীর পাড়া-মহল্লা ও এলাকাভিত্তিক ছিনতাইকারী গ্রুপ, কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আলাদা তালিকা ছিল থানায়।
নগর পুলিশের কর্মকর্তারা বলছিলেন, সমন্বিত ডেটাবেজের অভাবে এক থানার তালিকাভুক্ত অপরাধী অন্য থানা এলাকায় গিয়ে অপরাধ করলে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক অপরাধী কারাগার থেকে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে, যা হালনাগাদ তথ্যের অভাবে পুলিশ সময়মতো প্রতিরোধ করতে পারছে না। কোনো বড় ধরনের অপরাধ ঘটলে কিংবা ওপরমহলের নির্দেশ এলেই শুধু পুলিশ সাঁড়াশি অভিযানে নামছে। কিন্তু অপরাধীদের স্থায়ী কোনো ডিজিটাল প্রোফাইলিং বা ডেটাবেজ না থাকায় এসব অভিযানের কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।
কার্যকর অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রত্যেক অপরাধীর বায়োমেট্রিক ও অপরাধের ইতিহাস-সংবলিত একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা, শ্রেণিভিত্তিক অপরাধীর ডেটাবেজ তৈরি এবং ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক পুলিশিং জরুরি বলে মত দিয়েছেন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা।



