হুতির নজর এড়িয়ে আসছে লাখ টন জ্বালানি তেল
- ১৬ অক্টোবর ইয়ানবু বন্দর থেকে রওনা হয় এমটি এনড্রিওস
- ১ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ায় পৌঁছাবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হুতিদের মিসাইল আর ড্রোনের আতঙ্ক এখন লোহিতসাগর, বাব আল মান্দেব পাড়ি দিয়ে সৌদি আরব পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই বিশাল ঝুঁকির মধ্যেই এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে বাব আল মান্দেব প্রণালি পাড়ি দিয়েছে ‘এমটি এনড্রিওস’। ১৬ অক্টোবর জাহাজটি ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল নিয়ে ২২ অক্টোবর যখন সরু এই প্রণালি পাড়ি দিচ্ছিল, তখন জাহাজের গতিবিধি শনাক্তকারী এআইএস বন্ধ রাখা হয়। অন-বোর্ড রাডার ও জাহাজের বাইরের নেভিগেশন লাইটও পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। জাহাজ চলে একেবারে ধীরগতিতে। মূলত হুতিদের নজর আড়াল করতেই এই কৌশল।
সফলভাবে পাড়ি দিয়ে জাহাজ এখন শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের কাছাকাছি। ১ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ায় পৌঁছাবে। এরপর লাইটার জাহাজে তেল স্থানান্তর করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নেওয়া হবে। পরিশোধন শেষে সেটি দেশের বাজারে বিক্রি করা হবে।
স্বাভাবিক সময়ে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের তেল আসত পারস্য উপসাগর হয়ে। বড় জাহাজগুলো সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে তেল বোঝাই করত। এরপর হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে সরাসরি আরব সাগরে প্রবেশ করে বঙ্গোপসাগর হয়ে চট্টগ্রামে আসত। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রায় বন্ধ। বাধ্য হয়ে রুট বদলাতে হয়। সৌদি আরব তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল পাঠায় লোহিতসাগরের ইয়ানবু বন্দরে। সেখান থেকেই তেল বোঝাই করেছে জাহাজ ‘এমটি এনড্রিওস’। আর লোহিতসাগর থেকে বের হয়ে বঙ্গোপসাগরে আসতে হলে ইয়েমেন উপকূলের সরু ‘বাব আল মান্দেব’ প্রণালি পার হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই বাধ্য হয়েই এই নতুন রুট বেছে নিতে হয়েছে।
ঝুঁকি সত্ত্বেও কেন এই রুট বেছে নিয়েছে— জানতে চাইলে জাহাজের শিপিং এজেন্ট প্রাইম ওশান ট্রেড লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন বেলাল উদ্দিন চৌধুরী বললেন, ‘জাহাজের মালিক ও পরিচালনকারী কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন একমত হওয়ায় বাব আল মান্দেব পাড়ি দিতে হয়। ১৬ অক্টোবর রওনা দিয়ে ১৬ দিনেই জাহাজটি চট্টগ্রাম পৌঁছবে।’
এর আগে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন তেল সুয়েজ প্রণালি হয়ে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ৫০ দিনে চট্টগ্রাম পৌঁছেছিল এমটি নিনেমিয়া জাহাজ। তখন বিপুল পরিবহন খরচ গুনতে হয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে। এখন কত খরচ হলো, তা জানাতে পারেনি শিপিং লাইন।
ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য অপরিশোধিত তেল পরিবহনের কাজ করে সরকারি আরেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং) ক্যাপ্টেন মুজিবুর রহমান বললেন, ‘ঝুঁকি তো কিছুটা নিতেই হবে। ঝুঁকি নিয়ে আনার কারণে বিপুল পরিবহন খরচ সাশ্রয় হয়েছে। অবশ্য সরবরাহকারী ও বিপিসির একমতের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।’
এক লাখ টন তেল বাব আল মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজকে যুদ্ধঝুঁকি, ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ দ্বিগুণ দিতে হয়েছে। যদিও এর পরিমাণ কত, তা বিপিসি স্বীকার করেনি।
বাব আল মান্দেব প্রণালি পাড়ি দেওয়া বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সামুদ্রিক যাত্রা। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এই এলাকায় প্রতিনিয়ত অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। প্রণালিটি মাত্র ২০ কিলোমিটার চওড়া। ফলে চাইলেও দ্রুতগতিতে জাহাজ চালিয়ে পালানোর সুযোগ নেই। যেকোনো সময় একটি মিসাইল এক লাখ টন তেলের জাহাজকে ভাসমান বোমায় পরিণত করতে পারে। তবে এত ঝুঁকির পরও এই পথে জাহাজ চলাচল গত দুই মাসে কিছুটা বেড়েছে।
মেরিটাইম ডেটা বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় এক হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি পাড়ি দিয়েছে। আর চলতি অক্টোবর মাসে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৬টি কার্গো ও ট্যাংকার জাহাজ চরম ঝুঁকি নিয়েই এই পথ অতিক্রম করছে। এই জাহাজ চলাচল বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে, হুতিরা বাব আল মান্দেব প্রণালির দিকে নজর কমিয়েছে। হুতিরা এখন সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইন অর্থাৎ, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত করতেই ফোকাস করেছে।
আর বিপিসি জাহাজটির ট্র্যাকিং সিস্টেমে (এআইএস) স্পষ্টভাবে ‘গন্তব্য বাংলাদেশ’ এবং ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কহীন’ বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা করে। এতে জাহাজটি সৌভাগ্যক্রমে পাড়ি দিতে সক্ষম হয়।
সময় ও খরচের হিসাবটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রামে তেল আনতে সময় লাগত ১০-১২ দিন। তখন জাহাজ ভাড়া বাবদ খরচ হতো ১৫-২০ লাখ ডলার। কিন্তু হরমুজ এড়িয়ে এখন লোহিতসাগর ও বাব আল মান্দেব হয়ে আসতে সময় লাগছে ১৫-১৭ দিন। যুদ্ধঝুঁকির অতিরিক্ত বীমা (ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম) মিলিয়ে এখন খরচ পড়ছে ২৫-৩০ লাখ ডলার। অন্যদিকে, হুতিদের ভয়ে জাহাজটি যদি লোহিতসাগর এড়িয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ (কেপ অব গুড হোপ) ঘুরে আসত, তবে সময় লাগত ৩৫-৪০ দিন। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত জ্বালানি ও ভাড়াবাবদ খরচ লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়াত ৫০- ৬০ লাখ ডলারে।



