গৌরাঙ্গের রসগোল্লার গৌরব ৫৩ বছরের

শহর থেকে আনুমানিক ৩০ কিলোমিটার দূরে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ধারে পটিয়ার কমলমুন্সীর হাট। কাঁচাবাজারের ভেতরে কাদা মাখানো পথ মাড়িয়ে যেতে হয়। অপরিসর ছোট্ট একটি কক্ষ। ভাঙাচোরা আসবাবে সাজানো। স্যাঁতসেঁতে মেঝে। অন্ধকার, ধোঁয়ার ঝুলে ছেয়ে গেছে টিনের চাল। এত কালোর মধ্যে শুধু চোখে পড়ছে লাল রঙে লেখা সাইনবোর্ড ‘গৌরাঙ্গ মিষ্টি বিতান’।
অর্থাৎ আধুনিক সাজসজ্জা কিংবা ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এসব বিষয়ে কোনো গুরুত্ব নেই এই দোকানে। শুধু মিষ্টির ‘কোয়ালিটি’ বিবেচনা করে মানুষ ভিড় জমায় এখানে। সে কারণে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছে টানা ৫৩ বছর ধরে। সুমিষ্ট স্বাদের সঙ্গে গৌরবময় ঐতিহ্য।
সামনে পাতা মাত্র দুটি টেবিল। আরেক টেবিলে থরে থরে সাজানো প্যাকেট। অর্ডার দেওয়া মিষ্টি। পেছনে চুলা জ্বলছে। চুলায় বড় পাত্র। দুধ জ্বাল দিচ্ছে। চিনির সিরা বানানো হচ্ছে। টাটকা ছানার মোহনীয় ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ ছড়িয়ে গেছে দেশের গণ্ডি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে জীর্ণ-শীর্ণ ‘গৌরাঙ্গের দোকানের’ মিষ্টির লোভে। রসে ডোবা রসগোল্লা। এই দোকানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আইটেম।
আজ রবিবার দুপুরে দোকানটিতে গিয়ে দেখা গেল, দেদার বিক্রি হচ্ছে রসগোল্লা। রসমালাই, রসমঞ্জরি, জিলাপি, নিমকি, আমিত্তিও আছে।
দোকানকর্মীরা জানালেন, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫০ কেজি ছানা দিয়ে কয়েক পদের মিষ্টি তৈরি করা হয়। ছয় কেজি দুধ থেকে এক কেজি ছানা তৈরি করেন। এক কেজি ছানায় তিন কেজি মিষ্টি তৈরি করা হয়। কারিগর আছেন ১০ জন। দোকান মালিক সুমন দাশ নিজেও কারিগর।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজা, বাঙালির উৎসব পহেলা বৈশাখ, মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর, দুর্গাপূজা এবং আশপাশের এলাকায় উৎসব-পার্বণে বিক্রি প্রতিদিনের চেয়ে অন্তত দশগুণ বাড়ে। দোকানে বসে খাওয়ার চেয়েও বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসে বেশি। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ থেকে মিডিয়া জগতের তারকা এমন অনেকে জীর্ণ-শীর্ণ এই দোকানটিতে বসে মিষ্টি উপভোগ করেছেন।
দামের তালিকা টাঙানো আছে দেওয়ালে। প্রতি কেজি রসগোল্লা ২৮০ টাকা, রসমালাই প্রতি কেজি ৩২০ টাকা, রসমঞ্জরি ৪০০ টাকা। প্রতিদিন শুধু ১০০ কেজি রসগোল্লাই বিক্রি হয়।
তবে বিক্রিবাট্টা নিয়ে কথা বলতে তেমন আগ্রহী নন সুমন দাশ। তার ভাষ্য, ‘পত্রিকায় লিখলে ভ্যাটের লোকজন, প্রশাসনের লোকজন গিয়ে অহেতুক ডিস্টার্ব করেন। মানুষ আমাদের মিষ্টি ভালোবাসে। আমরা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি এটাই অনেক কিছু। আমরা কোয়ালিটি ধরে রেখেছি। মিষ্টির মধ্যে ক্ষতিকর কিছু মেশাই না। গ্রাহককে টাটকা মিষ্টি দেওয়ার চেষ্টা থাকে সবসময়।’
পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামের গৌরাঙ্গ দাশ ১৯৭৩ সালে দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। গৌরাঙ্গের বাবা সারদা দাশ ছিলেন মিষ্টির কারিগর। তার শিষ্য ছেলে গৌরাঙ্গ। আর গৌরাঙ্গের শিষ্য তার ছেলে সুমন। ১৯৮৩ সালে সারদা দাশ মারা যান। ২০১২ সালে গৌরাঙ্গ মারা যান। এরপর থেকে দোকানের পুরো ভার এখন সুমনের হাতে।
লোকগবেষক শামসুল আরেফীন বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গৌরাঙ্গের দোকানের মিষ্টির ভক্ত। খুব নামকরা মিষ্টি। এখনো গ্রামে গেলে সেখানে যাই। মিষ্টি কিনে নিয়ে আসি।’




