বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের আরেক উপদ্রব ‘বিষধর সাপ’

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদন্ডী ইউনিয়নের চরখিজিরপুর গ্রাম। গত শনিবার গভীর রাতে ওই গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমগীরের ঘুম ভাঙে মুরগির ডানা ঝাপটানোর শব্দে। টর্চ জ্বালিয়ে দেখেন একটি সাপ ফণা তুলে আছে। মুহূর্তেই ছোবল মারে। প্রাণ হারায় মুরগিটি। খবর পেয়ে পরদিন ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিমের সদস্যরা ওই ঘর থেকে একটি তীব্র বিষধর পদ্মগোখরা উদ্ধার করেন।
পাশের উপজেলা পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা আশীষ দেব রাতে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। ঘরের অদূরে হঠাৎ পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। বুঝতে পারেন সাপে কেটেছে। পরিবারের সদস্যরা তাকে রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ডাক্তাররা জানালেন, নির্বিষ সাপ হওয়ায় তিনি বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
বোয়ালখালী, পটিয়া শুধু নয়। চট্টগ্রাম জুড়ে বানভাসি লাখো মানুষের কাছে এখন চরম আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর, পৌরসভা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গত ৯ জুলাই একদিনেই অন্তত পাঁচজন বিষধর সাপের কামড়ে অসুস্থ হন।
শনিবার থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা আটজন রোগী ভর্তি হন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য, টানা অতিভারী বর্ষণ শুরুর পর থেকে বন্যা পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার রাত ৮টা পর্যন্ত মোট ৮৫ জন সাপে কাটা রোগীর তথ্য তারা পেয়েছেন। এর মধ্যে শনিবার পর্যন্ত ৭৫ এবং রবিবার একদিনে ১০ জন আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের অধিকাংশই পানিবন্দি এলাকার লোকজন।
তিনটি কারণে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার কথা জানালেন সাপ গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্ষাকাল হচ্ছে সাপের প্রজনন মৌসুম। এ সময় বিশেষ করে বিষধর ও তীব্র বিষধর যেসব সাপ আছে তারা তাদের বাসা ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং নারী-পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। প্রজননের সময় তারা খুবই অ্যাগ্রেসিভ মুডে থাকে।’
‘দ্বিতীয়ত বৃষ্টির পানি ঢুকে সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থান নষ্ট হয়ে গেছে। তারা গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। এ ছাড়া ঘরগিন্নিজাতীয় কিছু নির্বিষ সাপ আছে, যেগুলো বর্ষাকালে ডিম পাড়ার জন্য মানুষের ঘরে ঢুকে যায়। বিশেষ করে মাটির ঘরে। সেগুলো ঘরের ভেতর চলাচল করলে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। যদিও এসব সাপের কামড়ে তেমন ক্ষতি হয় না’— বললেন অধ্যাপক ওয়াহেদ।
গত এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামে টানা ভারী বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য, বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলা ও মহানগরে প্রায় ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। মারা গেছে ১১ জন। বন্যায় বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, পটিয়া ও বোয়ালখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোয় বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোয় সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বোয়ালখালী, পটিয়া ও বাঁশখালী। তবে ৮৫ জন রোগীর মধ্যে মাত্র তিনজন তীব্র বিষধর সাপে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ রাখা গেছে।’
বিভিন্ন উপজেলায় সাপে কাটা রোগীদের অধিকাংশই লাউডগা, ঘরগিন্নি বা ঘরচিতি, মেটেসাপ ও জলঢোঁড়াজাতীয় নির্বিষ সাপে আক্রান্ত হয়েছেন। পদ্মগোখরা, শঙ্খিনী, কালাচ, লাল গলা ঢোঁড়া ও সবুজ বোড়া বা গালটুয়া সাপের উপদ্রব বেড়েছে লোকালয়ে। এগুলো বিষধর সাপ।
দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানালেন, ঘরের মেঝে, খাট, আলমারি, ঘরের চালার খুঁটি এবং কোণগুলোয় সাপের দেখা মিলছে বেশি। ঘরের বাইরে জমে থাকা পানিতে ভেসে থাকা সাপের দেখাও মিলছে। সাপের ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে অনেককে।
অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বললেন, ‘দুই প্রজাতির কোবরা, তিন প্রজাতির কেউটে, দাঁড়াশ, পানিসাপ এগুলো মূলত বেশি দেখা যায় বর্ষাকালে কিংবা বন্যা হলে। আর পাহাড়ি ঢলের মাধ্যমে কিং কোবরা, অজগর লোকালয়ে এসে পড়ে। কেউটে সাপ সবচেয়ে বেশি কামড়ায় ঘুমের মধ্যে। কোবরার ঘুমন্ত অবস্থায় কামড়ানোর তেমন রেকর্ড নেই। এরা নিজেরা আক্রান্ত অনুভব না করলে সাধারণত আক্রমণ করে না।’
অধ্যাপক ওয়াহেদের পরামর্শ, এ মুহূর্তে পানিবন্দি এলাকার লোকজনকে সাপের বিষয়ে নিজেরা সচেতন থেকে চলাফেরা করতে হবে। আক্রান্ত হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। পানি নেমে গেলে সাপও দ্রুত লোকালয় ছেড়ে যাবে বলে তিনি জানালেন।
জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সাপ নিয়ে জরুরি সতর্কবার্তায় জানাল, রাতের অন্ধকারে চলাচলের সময় অবশ্যই টর্চলাইট বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। হাতে লাঠি রাখা ও জমে থাকা পানিতে লাঠির আঘাতের শব্দ করতে করতে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। মেঝেতে না ঘুমানো ও অবশ্যই মশারি ব্যবহার করা এবং সাপে কাটলে ওঝা-কবিরাজ বাদ দিয়ে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে যাওয়া।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ‘আমাদের প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ১০০ জন সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার উপযোগী এক হাজার ভায়াল এন্টিভেনম আমাদের কাছে মজুদ আছে। নিয়মিত এন্টিভেনম আসছে। মাঝেমধ্যে আমরা লোকাল মার্কেট থেকেও কিনে নিচ্ছি।’
বন্যা পরিস্থিতিতে সাপে কাটা রোগী নিয়ে সতর্ক থাকার কথা জানালেন চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটা স্বাভাবিক বর্ষাকালে বা বন্যা পরিস্থিতিতে সাপে কাটা রোগী বেড়ে যায়। এবার তো অনেক এলাকা পানিবন্দি হয়ে আছে। সেটা বিবেচনায় রেখে সাপে কাটা রোগীর বিষয়ে আমরা খুব সিরিয়াস। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম আছে। সাপে কাটা রোগী দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছালে তাকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা আমরা দিতে পারব।’





