ডিও লেটারে চেয়ার গেল ওসির, ফের আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও ওসি মুহাম্মদ শরীফ। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদরঘাট থানার ওসি মুহাম্মদ শরীফকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ পরিদর্শক হলেও সিএমপিতে তিনি অন্যতম ক্ষমতাধর কর্মকর্তা ‘ওসি শরীফ’ হিসেবে আলোচিত ছিলেন।
যোগদানের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় তাকে প্রত্যাহারের আদেশ নিয়ে নগর পুলিশে আলোচনা চলছে। সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করে গতকাল রবিবার রাতে সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আদেশ জারি করেন।
এ নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে জানা গেল, গুরুতর দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শরীফকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একটি আধা সরকারি (ডিও) লেটারের ভিত্তিতে। ডিও লেটারের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো নির্দেশনায় সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওসি শরীফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানালেন সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিছু কথা যেহেতু উঠেছে সেগুলো যাচাইবাছাই করে দেখা হবে। একজন উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
গতকাল রবিবার পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) পাঠানো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ অধিশাখার উপসচিব নাসরিন সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত থেকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে আবার মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।
উপসচিব নাসরিন সুলতানা অফিস আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাদের সচিব স্যার যেভাবে বলেছেন সেভাবে চিঠি তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ডিও লেটারটি (নম্বর – ৪৭.০০.০০০০.০০১.২৫.২০২৬-৫৬১) পাঠিয়েছেন গত ১ জুলাই। তিনি বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য। সিএমপির একজন ওসির জন্য বগুড়ার এমপি যিনি আবার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন, তিনি কেন ডিও লেটার পাঠালেন? সেটা নিয়ে নগর পুলিশে সৃষ্টি হয়েছে নানা কৌতূহল।
ডিও লেটারের বিষয়বস্তু নিয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে মোবাইলে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। মোবাইলে এবং হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে মেসেজ দিলেও কোনো জবাব দেননি। প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব তৌহিদুল ইসলাম টিটুও কল রিসিভ করেননি।
মোবাইলে কল দিয়ে পাওয়া গেল প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ তাসনিমুজ্জামানকে। ডিও লেটারটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘অনেক ডিও লেটারই তো পাঠাই। এ ধরনের কিছু পাঠিয়েছি কিনা আমার মনে পড়ছে না। আপনি বরং প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলুন।’
কল রিসিভ করছেন না জানালে তাসনিমুজ্জামান প্রতিমন্ত্রীর দফতরের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সিএমপির গোয়েন্দা ইউনিটের (ডিবি-দক্ষিণ) পরিদর্শক পদে দায়িত্বরত অবস্থায় মুহাম্মদ শরীফকে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন হয়েছিল। দেড় মাস পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন তালুকদারের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ওসি। চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের এক ব্যবসায়ী ও এক ইউপি সদস্যকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তখন তার বিরুদ্ধে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে চরলক্ষ্যা ইউনিয়নে ১০ বছর বয়সি শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের নামে অর্থ আদায় এবং পরে শিশুটির মাকে বিষয়টি চেপে যেতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ওসি শরীফের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী। কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ থাকাসহ আরও নানা অভিযোগে তিনি আলোচিত ছিলেন।
এছাড়া সিআইডির পরিদর্শক থাকার সময় বিদেশি মুদ্রা উদ্ধারের এক মামলার তদন্ত নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে শরীফের বিরুদ্ধে। এজন্য ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ওসি শরীফকে সশরীরে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। জব্দ করা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত (প্রমাণ) আদালতে জমা না দিয়েই এবং নিজের হেফাজতেও সংরক্ষণ না করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর শরীফকে কর্ণফুলী থানা থেকে সিএমপির বিশেষ শাখায় বদলি করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর সেখান থেকে তাকে অ্যাস্টেট এন্ড বিল্ডিং শাখার পরিদর্শক হিসেবে বদলি করা হয়। গত ১৮ জুন তাকে সদরঘাট থানার ওসি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সিএমপিতে কর্মরত এক পরিদর্শক বললেন, কর্ণফুলী থানায় ব্যাপক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মাথায় নিয়েও সম্প্রতি আবার ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন মুহাম্মদ শরীফ। বিভিন্ন থানায় ওসি পদায়নে পর্দার আড়াল থেকে ভূমিকা রেখেছিলেন। রাজনৈতিক নানা বিতর্ক তুলে দক্ষ ও চৌকস হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করতে তিনি কলকাঠি নাড়েন।
এসব অভিযোগের পাশাপাশি একজন অতিরিক্ত ডিআইজির সঙ্গে মুহাম্মদ শরীফের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির বিষয়ও সিএমপিতে বেশ আলোচিত হচ্ছে।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা একটি অভিযোগেরও সত্যতা নেই বলে দাবি করলেন মুহাম্মদ শরীফ। বললেন, ‘আমি সামান্য একজন ইন্সপেক্টর লেভেলের কর্মকর্তা। আমি কেন এসব কাজ করে শুধু শুধু নিজের ক্ষতি করব? পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। একজন স্যার আমাকে ভুল বুঝে আমার বিরুদ্ধে লেগেছেন। আমি স্যারকে বারবার বুঝিয়েছি। কিন্তু তারপরও আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় উনি নানা অভিযোগ করে আমার ক্ষতি করছেন।’
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ডিও লেটারটিও অতিরিক্ত ডিআইজি পদের ওই কর্মকর্তার ‘ইন্ধনে’ হয়েছে বলে সন্দেহ শরীফের।







