ঋণপত্র খোলা সহজ হলো, বিদেশি ফলের দাম কমবে?

ছবি: আগামীর সময়
ফল আমদানিতে ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে শতভাগ মার্জিনের বাধ্যবাধকতা ইতোমধ্যে তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক কোটি টাকার একটি ঋণপত্র খুলতে পুরো টাকা আগাম ব্যাংকে জমা দিতে হতো। সেই কড়াকড়ি শিথিল করায় ঋণপত্র খোলা অনেক সহজ হলো। এখন ন্যূনতম মার্জিন বা বাকিতেও ফল আমদানি করা যাবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ফিরেছে। এখন ছোট আমদানিকারকরাও ফল আমদানির সুযোগ পাচ্ছে। এই পদক্ষেপে ব্যবসায়িক মহলে স্বস্তি ফিরলেও প্রশ্ন উঠেছে—আসলেই কি কমবে আমদানিকৃত আপেল, কমলা, আঙুরের মতো পুষ্টিকর ফলের দাম?
আমদানিকারকরা বলছেন, ফলের দাম শুধু এলসি মার্জিনের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারদর। ফ্রেইট চার্জ বা জাহাজ ভাড়া। কাস্টমস ডিউটি ও শুল্কায়ন মূল্য এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাড়তি পরিবহন ভাড়াও ফলের দামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে। ফলে দাম কত কমবে এখনই বলা যাবে না।
চট্টগ্রামের বিআরটিসি ফলমন্ডিতে দীর্ঘসময় ফল আমদানি করছেন হাজী আলমগীর। ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। তিনি কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘বাকিতে ফল আমদানির সুযোগ দেওয়ায় বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। স্ক্র্যাপ, সিমেন্ট, কাপড় ব্যবসায়ীরাও এই সেক্টরে চলে আসবেন। প্রথমদিকে হয়তো দাম কমবে। পরে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে।’
২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা করতে সরকার বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপ করে। তখন ঋণপত্র খুলতে কড়াকড়ি করে। বিভিন্ন পণ্যের এই তালিকায় যুক্ত হয় ফল আমদানিও। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র খোলার সঙ্গেই পুরো আমদানিমূল্যের সমপরিমাণ নগদ টাকা ব্যাংকে আটকে থাকত। অনেক ক্ষেত্রে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই মার্জিন জোগাড় করতে হতো। এরপর থেকেই ফলে আমদানি কমে যায়। দাম চড়া হয়। ২০২৪ সালে এসে শুল্ক আরেকদফা বাড়লে ছোট আমদানিকারকরা বাজার থেকে ছিটকে পড়েন। ফলের দাম ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
ফলমন্ডির ব্যবসায়ীর নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলছেন, ‘ক্রেতার নাগালে আনতে হলে শুল্ক কমানোর কোন বিকল্প নেই।’
এখন খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চীনা আপেল ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা। দক্ষিণ আফ্রিকার আপেল ৩৫০ থেকে ৪২০ টাকা। মাল্টা ৩২০, কমলা সাড়ে ৩শ টাকা। লাল আঙুর ৪৫০, সবুজ আঙুর ৪৩০ টাকা।
২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টন তাজা ও শুকনো ফল আমদানি করে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে সরকার।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতির মতো তাজা ও বিদেশি ফল আমদানির ক্ষেত্রে মোট শুল্ক-কর ছিল ১৩১ থেকে ১৩৬ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ ১০০ টাকার ফল আমদানি করলে শুল্ক ও কর বাবদ প্রায় ১৩১ থেকে ১৩৬ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের চাপ থাকলেও ফল আমদানিতে নতুন করে আর শুল্কহার বাড়ানো হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার ফলে আমদানিকারকদের এলসি খোলার মূলধন খরচ বা 'কস্ট অফ ফান্ড' এক ধাক্কায় ১৫ শতাংশ কমে আসবে। আগে যেখানে ১ কোটি টাকা আমদানির জন্য পুরো ১ কোটি টাকাই ব্যাংকে আটকে রাখতে হতো, এখন ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ১০ থেকে ২০ শতাংশ মার্জিনেই এলসি খোলা যাচ্ছে। শুল্কহার অপরিবর্তিত থাকলেও শুধুমাত্র এলসি সহজীকরণ, পরিবহন ব্যয় স্বাভাবিক হওয়া এবং আমদানিকারক বৃদ্ধির ফলে ভোক্তা পর্যায়ে আপেল, মাল্টা ও আঙুরের দাম কেজিপ্রতি অন্তত ২০ শতাংশ কমা উচিত।





