চট্টগ্রামের ‘নীরব এলাকায়’ কান পাতা দায়
- হাসপাতাল-স্কুলের সামনেও শব্দের মাত্রা মানদণ্ডের চেয়ে ২৫ ডেসিবেল বেশি
- নগর জুড়ে শব্দের তাণ্ডব

তীব্র শব্দদূষণে অতিষ্ঠ কাতালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী, ছবি: আগামীর সময়
কাতালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী সড়ক লাগোয়া শিশুদের এই বিদ্যালয়। পাশেই চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার অলি খাঁ মসজিদ মোড়। এই মোড়ে সবসময় গাড়ির জটলা লেগে থাকে। গাড়ির-হর্ন, রিকশার ক্রিং ক্রিং, মানুষের হল্লা-কানপাতা দায়। এরমধ্যে বিদ্যালয়টি চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক নুসরাত জাহান।
তিনি বললেন, ‘মাঝে মাঝে গাড়ির বিকট হর্ন শুনে শিশুরা কান চেপে ধরে মাথা নিচু করে ফেলে। শব্দের কারণে শিক্ষকরাও প্রায় মাথা ব্যথায় ভোগেন। ক্লাসও নিতে হয় চিৎকার করে।’
এই বিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরুত্ব মাত্র ৬০০ মিটার। এখানেও দেদার হর্ন বাজিয়ে চলছেন গাড়ির চালকরা। অথচ আইন অনুযায়ী দুটিই নীরব এলাকা। যেখানে দিনে শব্দের মানমাত্রা ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল হওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) এক জরিপে দেখা গেছে, এমন নীরব এলাকাতেও দিনে শব্দের মাত্রা ৭৫ দশমিক ৪ ডেসিবেল এবং রাতে ৬৫ দশমিক ২ ডেসিবেল। অর্থাৎ মানমাত্রার চেয়ে ২৫ ডেসিবল বেশি। সিডিএ প্রকাশিত নগরের খসড়া মহাপরিকল্পনায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত শব্দের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, রোগীদের রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগের জটিলতা ও মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুম পর্যন্ত তীব্র হর্নের শব্দ পৌঁছানোয় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তারা।
মহাপরিকল্পনায় শব্দদূষণের পেছনে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশের ১০০ মিটার সীমানায় ‘নীরব জোন’ নির্দেশক সাইন বোর্ডের অনুপস্থিতি, ভারী যানবাহনের বিকল্প সড়ক বা ডাইভারশন রুট না থাকা, চালকদের একটানা হর্ন বাজানোর প্রবণতা, রিয়েল-টাইম শব্দ পরিমাপক সেন্সরের অভাব এবং আইনের নিয়মিত প্রয়োগ না থাকা।
নগর জুড়ে শব্দের তাণ্ডব
মহাপরিকল্পনার তথ্য অনুযায়ী, নগরের বাণিজ্যিক, আবাসিক, শিল্প, মিশ্র ও নীরব এলাকায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছিল। জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকাতেই শব্দের মাত্রা সরকার নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের বেলা শব্দের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ ৮২ দশমিক ৩ ডেসিবেল, রাতে যা ৭৩ দশমিক ৩ ডেসিবেল পর্যন্ত।
আবাসিক এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৬১ ও রাতে ৫৫ ডেসিবেল। শিল্প এলাকায় দিনে ৭৮ ও রাতে সাড়ে ৭৬ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকায় দিনে সাড়ে ৮৯ ও রাতে ৮৪ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এমনকি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অধ্যুষিত নীরব এলাকাতেও দিনে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৭৫ ডেসিবেল শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে মানদণ্ড দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল।
নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার, কালুরঘাট এবং খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই এলাকার মতো ব্যস্ত বাজারগুলোতে দিনে শব্দের মাত্রা ৭৪ থেকে ৭৯ ডেসিবেল এবং রাতে ৬৪ থেকে ৬৮ ডেসিবেলের মধ্যে পাওয়া গেছে। যেখানে সরকারি মানদণ্ড দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল। অলংকার মোড়, অক্সিজেন মোড় ও পটিয়ার শান্তিরহাটের মতো ব্যস্ত সড়ক ও মিশ্র এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ৬৮ থেকে প্রায় ৮৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৫৮ থেকে প্রায় ৭৭ ডেসিবেল পর্যন্ত মিলেছে। যেখানে মানদণ্ড দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল।
হাসপাতাল-বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাও 'হটস্পট'
মহাপরিকল্পনার সমীক্ষায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলশীর ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) এবং হাটহাজারী রোডের কুয়াইশ বুড়িশ্চর শেখ মোহাম্মদ সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে শব্দদূষণের চরম ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নীরব এসব এলাকাতেও শব্দের মাত্রা দিনে ৫৩ থেকে প্রায় ৬৯ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৪ থেকে ৬০ ডেসিবেল পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যেখানে মানদণ্ড দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল।
নগরের আমতল মোড়ের সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক গৌরী দাশ বলেছেন, ‘এখানে শুধু হর্ন না, নানা ধরনের শব্দে অতিষ্ঠ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে উচ্চ শব্দ শুনতে শুনতে একধরনের গা সওয়া হয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের আশপাশে নীরব এলাকা নির্দেশক কোনো সাইন বোর্ড দেখিনি।’
গত রবিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে প্রায় আোঘণ্টা অবস্থান করে দেখা গেছে, এখানে হর্ন বাজানো যাবে না এমন কোনো সাইন বোর্ড দেখা যায়নি। রোগী নিয়ে আসা সিএনজি অটোরিকশার চালকরা ইচ্ছামতো হর্ন দিচ্ছেন। অন্তত পাঁচজন চালকের কাছ থেকে জানতে চাইলে তারা জানিয়েছেন, ‘হাসপাতাল এলাকায় হর্ন দেওয়া যাবে না এটা তারা জানেন না।’
কয়েক দশকের চিকিৎসার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘পরিবহন শ্রমিকদের অধিকাংশের শ্রবণশক্তি কম। এ কারণে তারা মনে করেন, অন্যদের হয়তো একই সমস্যা হতে পারে। তাই রাস্তায় বারবার হর্ন দিতে থাকেন তারা। শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি শুধু কমছে না, স্থায়ী বধিরতাও তৈরি হচ্ছে। শব্দদূষণের বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা। কারণ তারা শব্দের বিষয়ে সংবেদনশীল।’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (ইএমপি) প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে (আগামী ১ থেকে ৩ বছর) নীরব জোনের সাইন বোর্ড স্থাপন, ব্যস্ত সময়ে বিকল্প ট্রাফিক রুট চালু এবং স্বয়ংক্রিয় হর্ন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বসিয়ে তাৎক্ষণিক জরিমানার সুপারিশ রয়েছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে (আগামী দুই থেকে পাঁচ বছর) সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের সীমানায় শব্দশোষক গাছপালা রোপণ ও শব্দ নিরোধক প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন পর্যায়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ‘নয়েজ কন্ট্রোল সেল’ ও নাগরিক অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠারও সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক বেগম সোনিয়া সুলতানা বলেছেন, ‘শব্দদূষণ রোধ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন এলাকায় সাইন বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনকে তাদের কর্মপরিকল্পনায় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা দিয়ে সাইন বোর্ড স্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন বলেছেন, ‘ইতোমধ্যে সাইন বোর্ড তৈরি করতে দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে নীরব এলাকায় সাইন বোর্ড স্থাপন করা হবে।’





