ফিরে এলো সেই শিরোনাম
‘কাকের শহর চট্টগ্রাম, রক্তে ভেজা রাউজান’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এরশাদ আমলের শেষদিকের কথা। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হচ্ছে চট্টগ্রামের রাউজান। লাশ পড়ছে নিয়মিত। রাজনৈতিক কর্মীদের রক্তে ভিজছে রাউজানের মাটি। এমনই এক রক্তাক্ত সকালে দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় ছাপা হয় একটি উপসম্পাদকীয়। ‘কাকের শহর চট্টগ্রাম, রক্তে ভেজা রাউজান’। ছাপা কাগজের রমরমা আমলে সেই শিরোনাম পড়ে সারা দেশের মানুষ শিহরিত হয়েছিল।
অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের স্মৃতিধন্য রাউজান উপমহাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান, আবার পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। রাজনীতির অনেক প্রবাদপ্রতিম নেতা, এমপি, মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, মনীষী জন্ম দিয়েছে এই রাউজান।
ঐতিহাসিক রাউজানে আবারও যেন ফিরে এসেছে আশির দশক। ২০ মাস ধরে চলছে রক্তের হোলিখেলা। মুছে যাওয়া ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ তকমা আবার ফিরে এলো রাউজানে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শুধু এই এক উপজেলায় খুনের শিকার হয়েছে ২৩ জন। এর মধ্যে ১৯টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। নিহতদের মধ্যে ১৬ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
এই খুনোখুনির মধ্যে মানুষের স্মৃতিতে আবারও ফিরে আসছে বাংলার বাণীর সেই তোলপাড় তোলা শিরোনাম। প্রবীণ সাংবাদিক এম নাসিরুল হক আশির দশকে ছিলেন দাপুটে রিপোর্টার। রাউজানে প্রতিদিন লাশ পড়ার সেসব ঘটনা পত্রিকার পাতায় তুলে ধরার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়, ‘আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে অন্তত এক দশক পর্যন্ত রাউজানের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। মানুষ রাউজানের নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে উঠত। আমার মনে আছে, একনাগাড়ে ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। নিহতদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী ছিল। নীহার রঞ্জন বিশ্বাস নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল রাউজান থানার পাশে।’
২০ মাস ধরে চলছে রক্তের হোলিখেলা। মুছে যাওয়া ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ তকমা আবার ফিরে এলো রাউজানে
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিভিন্ন পদে কাজ করা সাবেক এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘সে সময় রাউজান অশান্ত হয়েছিল মূলত আলোচিত চৌধুরী পরিবার বনাম আওয়ামী লীগের লড়াইয়ের কারণে। একদিকে পাকিস্তান আমল থেকে প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবারের রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার লড়াই। অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও পাল্টা আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জোর-জবরদস্তি। সেই লড়াইয়ে গেল অকালে অনেক প্রাণ।’
তো, কীভাবে এসেছিল বাংলার বাণীর সেই শিরোনাম? সেই সময়ের ছাত্রনেতা ও রাউজান পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান দেবাশীষ পালিত তুলে ধরলেন ইতিহাসের খানিকটা। ১৯৮৯ সালের ৫ এপ্রিল। রাউজান কলেজের সাবেক-বর্তমান দুই ভিপি ফখরুদ্দিন বাবর ও মুজিবুর রহমানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। উভয়ে ছিলেন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সেই সময়ের জনপ্রিয় নেতা। তাদের খুনের প্রতিবাদে হরতাল, সভা-সমাবেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামে।
দেবাশীষ পালিতের ভাষ্য, ‘তখন রাউজানে কোনো হত্যাকাণ্ড হলে তার জেরে আতঙ্কের শহরে পরিণত হত চট্টগ্রাম। নগরীর আন্দরকিল্লায় জেনারেল হাসপাতালের পাহাড়ে ছিল মর্গ। রাউজানে নিয়মিত খুনখারাবি হত আর লাশ নেওয়া হত সেখানে। মর্গের ওপর উড়ত শহুরে কাক। সেই সময়টাকে বোঝানোর জন্যই বাংলার বাণী এমন হেডলাইন করেছিল। এটা প্রতিবাদী মানুষের মনে দাগ কেটেছিল।’
নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেকে রাউজানে রাজনৈতিক সংঘাত কমতে থাকে। ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর বেশ কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী কথিত ক্রসফায়ারে মারা পড়ে। অনেকে পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। এরপর রাউজানের সন্ত্রাসী জনপদের তকমা খানিকটা ঘুচে। আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ১৫ বছরের শাসনামলে সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর একাধিপত্যে রাউজানে তৈরি হয়েছিল ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। যত বড় প্রভাবশালী কিংবা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হোক, ‘একনায়ক’ ফজলে করিমের রাজ্যে কারও টুঁ শব্দ করার সুযোগ ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাদের ১৮ মাসে ২০টি খুন ও শতাধিক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শতাধিক মানুষ। আর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত তিনটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২৩টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মাত্র চারটির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের কোনো যোগসূত্র পায়নি পুলিশ। বাকি হতাহতদের অধিকাংশই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। চারজন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীও হত্যার শিকার হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছে, ফজলে করিম যুগের অবসানের পর পালিয়ে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীরা ফিরে আসে এলাকায়। বিএনপির দুই কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীদের মধ্যে আবার চাঙা হয়ে যায় পুরনো বিরোধ। শুরু থেকেই দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা আধিপত্য বজায় রাখার জন্য হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি এলাকায় যাবার সময় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে গোলাম আকবর খোন্দকার নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।
২৩টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মাত্র চারটির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের কোনো যোগসূত্র পায়নি পুলিশ। বাকি হতাহতদের অধিকাংশই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী
মাটি ও বালুর ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিতেই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি সহিংসতা। এ নিয়ে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের ক্যাডার রায়হান আলম গ্রুপ এবং তাদের প্রতিপক্ষ আরও একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। র্যাব-পুলিশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ অপরাধী রায়হানের বাড়িও রাউজানে।
সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে রাউজানে যেসব সহিংসতা ঘটেছে তার অধিকাংশই এই ক্যাডার গ্রুপগুলোর দ্বন্দ্বে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসানের ভাষ্য, ‘গত দুদিনে দুটি মার্ডার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ যে ঘটনা, সেটা হয়েছে সন্ত্রাসী রায়হান গ্রুপ ও তার প্রতিপক্ষের বিরোধের কারণে। যে মারা গেছে, সে রায়হান গ্রুপের লোক। তার বিরুদ্ধেও পাঁচ-ছয়টা মামলা আছে। এরকম বেশ কয়েকটা মার্ডার হয়েছে সন্ত্রাসীদের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্বের জেরে। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব এই সন্ত্রাসীগুলোকে গ্রেপ্তার করা। রাউজানে শিগগিরই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
রাউজান আবার কেন অশান্ত, প্রশ্ন ছিল বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকারের কাছে। বললেন, ‘সেই সময়ে (আশির দশক) যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাউজানে হত্যাকাণ্ড হয়েছিল, এখনো তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। আমি এর বেশি কিছু বলব না।’
একই প্রশ্নের জবাব ব্যস্ত থাকার কথা বলে এড়িয়ে যান বিএনপিদলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী।



