দেশের বৃহত্তম শুঁটকি কেন্দ্রে এবার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এলো

ছবি: আগামীর সময়
জ্যৈষ্ঠের খরতাপে এখনো উত্তপ্ত কক্সবাজার উপকূল। আকাশজুড়ে তীব্র রোদের দাপট, মাঝে মাঝে কালবৈশাখীর আভাস মিললেও ভারী বৃষ্টির দেখা নেই। শুঁটকি উৎপাদনের জন্য এমন আবহাওয়া আদর্শ হলেও দেশের বৃহত্তম শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র কক্সবাজারের নাজিরারটেকে এবার দেখা যায়নি সেই চিরচেনা কর্মচাঞ্চল্য।
নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলা সদ্যসমাপ্ত শুঁটকি মৌসুম শেষ হয়েছে হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। মৌসুম শেষে হিসাব কষে দেখা গেছে, একসময় প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার বাণিজ্য ঘিরে আবর্তিত হওয়া এই শিল্প এবার সঙ্কুচিত হয়ে নেমে এসেছে ২০০ কোটির নিচে। সামুদ্রিক মাছের তীব্র সংকটে উৎপাদন হ্রাস এবং কাঁচামালের অভাবে কার্যত অর্ধেকে নেমে এসেছে শুঁটকি ব্যবসার আকার।
কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লীতে এখন অধিকাংশ মাচাই খালি পড়ে আছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ভাষ্য, পুরো মৌসুমজুড়েই কাঁচা মাছের সংকট উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
মৌসুমের শেষভাগে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৭০০ শুঁটকি মহালের মধ্যে অন্তত ৬০০টিই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত রোদ, শ্রমিক এবং অবকাঠামো থাকলেও মাছের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বললেন, ‘মাছ শুকানোর আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত স্টোরেজ ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব মাছ আহরণ এবং শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে আগামী বছরগুলোতে সংকট আরও গভীর হবে।’
কক্সবাজার সামুদ্রিক শুঁটকি উৎপাদন ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন জানালেন, ‘মৌসুম শেষ হয়েছে, মাচাগুলো প্রায় খালি পড়ে আছে।’
এক যুগের বেশি সময় ধরে শুঁটকি শিল্পে কাজ করা শ্রমিক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বললেন, ‘রোদ ছিল, শ্রমিক ছিল, মাচা ছিল—কিন্তু মাছ ছিল না। মাছ না থাকলে শুঁটকি হবে কীভাবে?’
নাজিরারটেকের শুঁটকি শিল্পে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিনের। মাছ পরিষ্কার, বাছাই, শুকানোর মাচায় সাজানো এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় অংশজুড়েই রয়েছে তাদের অবদান। কিন্তু কাজ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন তারাই।
শ্রমিক আয়েশা বেগম বললেন, ‘আগে প্রায় প্রতিদিন কাজ পাইতাম। এখন অনেক দিন বসে থাকতে হয়। আয় না থাকলে সংসার চলবে কীভাবে?’
মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে অন্তত ৪০ হাজার শ্রমিক আংশিক বা পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এদের বড় অংশই নারী এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত উপকূলীয় পরিবারের সদস্য।
জেলেদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সাগরে জেলিফিশের আধিক্যও মাছের স্বাভাবিক উপস্থিতি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক ট্রলারকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
কুতুবদিয়ার জেলে আবুল হাসান জানালেন, মার্চ-এপ্রিল জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ব্যাহত হয়েছে। যে কয়েকটি ট্রলার সাগরে যেতে পেরেছে, সেগুলোও প্রত্যাশিত মাছ পায়নি।
উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে শুঁটকির সরবরাহও কমেছে। ফলে গত মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকির দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে বর্তমানে লইট্টা, ছুরি, রূপচাঁদা, কোরালসহ বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকির দাম আগের বছরের তুলনামূলক বেশি।
কক্সবাজারের শুঁটকি দেশীয় বাজার ছাড়াও হংকং, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।




