দিনভর কেন্দ্রে বন্দি ১৬০ শিক্ষার্থী রাতে পরীক্ষা!

সংগৃহীত ছবি
বাইবেল অনুযায়ী শনিবার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট মণ্ডলীর পবিত্র বিশ্রামদিন। এদিন ঈশ্বরের আরাধনা করে কাটান তারা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আগের দিন শুক্রবার সূর্যাস্ত থেকে পরদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত জাগতিক কোনো কাজ করা যায় না। কিন্তু চলতি বছর শনিবার এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় বিপাকে পড়েছেন সারা দেশে এ সম্প্রদায়ের ১৬০ শিক্ষার্থী। যেহেতু দিনের বেলা তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না, তাই বিকল্প হিসেবে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে সূর্যাস্তের পর। আর প্রশ্নফাঁস এড়াতে দিনভর তাদের বন্দি থাকতে হবে কেন্দ্রে। অর্থাৎ, সহপাঠীদের সঙ্গে একই সময়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও তারা বের হবেন পরীক্ষা শেষে রাতে। এই পুরো সময় বসে থাকতে হবে পরীক্ষাকেন্দ্রে।
আর শুধু এক শনিবার নয়, পরীক্ষা চলাকালে ছয়টি
শনিবারই তাদের এই রুটিন অনুসরণ করতে হবে। নিকট অতীতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের ঘটনা এটিই প্রথম।
এ ব্যবস্থাকে কঠিন মানসিক চাপ হিসেবে দেখছেন অভিভাবকরা। শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এটি পরীক্ষার নামে নিপীড়ন। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানালেন, শিক্ষাবর্ষ এগিয়ে আনতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে শিক্ষার্থীরা দুই বছরের সেশন দুই বছরেই শেষ করতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাডভেন্টিস্ট মিশনের কর্মকর্তারা জানালেন, গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাদের প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। শনিবার তারা নির্ধারিত সকাল সাড়ে ৯টায় পরীক্ষার হলে প্রবেশ করলেও ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে পরীক্ষায় অংশ নেবেন না। প্রায় ৯ ঘণ্টা একটি কক্ষে বন্দি থেকে সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যায় পরীক্ষার উত্তরপত্রে লেখা শুরু করবেন তারা। রাত ১০টায় শেষ হবে তাদের পরীক্ষা।
শিক্ষা বোর্ডের শর্ত অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টায় পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নির্দিষ্ট কক্ষে অবস্থান করতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের পর তাদের কাছে প্রবেশপত্র ছাড়া অন্য কিছু থাকবে না। কোনো অবস্থাতেই তারা কক্ষের বাইরে যেতে বা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না।
গতকাল শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা (এইচএসসি) চলবে ৪ আগস্ট পর্যন্ত। এই সময়ে ছয়টি শনিবার পরীক্ষা হবে। এর মধ্যে আগামী শনিবার হবে বাংলা (আবশ্যিক) দ্বিতীয় পত্র, ৮ জুলাই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আবশ্যিক), ১৮ জুলাই ভূগোল (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র, ২৫ জুলাই অর্থনীতি দ্বিতীয় পত্র, ১ আগস্ট মনোবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র ও কৃষি (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র এবং ৮ আগস্ট ফিন্যান্স ব্যাংকিং ও বিমা দ্বিতীয় পত্র ও শিশু বিকাশ দ্বিতীয় পত্র।
সাধারণত বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে এবং এই দিনে এইচএসসি বা সমমানের বড় কোনো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না।
তাহলে এবার কেন শনিবার পরীক্ষা রাখা হলো— জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বললেন, ‘দুই বছরে শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে এবার শনিবারও পরীক্ষা রাখা হয়েছে, যাতে পরবর্তী সেশনের পরীক্ষা আরও এগিয়ে আনা যায়। এই পরীক্ষার্থীরা সকালে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হলে প্রবেশ করে একটা কক্ষে অবস্থান করবে। সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ী তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে।’
হালিশহর ক্যামব্রিয়ান কলেজের ছাত্রী এঞ্জেলি সুয়ারি ত্রিপুরার অভিভাবক সুনীল ত্রিপুরা জানালেন উদ্বেগের কথা। তিনি বললেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টায় সন্তানদের হলে উপস্থিত থাকতে হবে। সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা পৌনে ৭টায়। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টারও বেশি বাচ্চারা একটা কক্ষে বন্দি থাকবে। সকালে বাসা থেকে খেয়ে যাবে। কিন্তু সারাদিন কোথায় খাবে, কী করবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। দীর্ঘ সময় এভাবে বসে থাকার পর রাতে তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দেওয়া যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই চরম মানসিক চাপের।’
১৬০ শিক্ষার্থীর এই বিশেষ মানবিক ও ধর্মীয় সংকট এবং দীর্ঘ সময় কেন্দ্রে বন্দি রাখার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলীম বললেন, ‘এটি পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের নিপীড়ন। পরীক্ষার রুটিন চূড়ান্ত করার আগে অংশীজন ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে প্রস্তাব পাঠানো উচিত ছিল। আমাদের দেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংবেদনশীল দিনগুলোর কথা বিবেচনা করেই রুটিন তৈরি করা উচিত। যাতে কারও কোনো অসুবিধা না হয়। মূল ধারার অন্য শিক্ষার্থীদের মতো সমপরিবেশে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার এই পরীক্ষার্থীদেরও আছে।’
১২ ঘণ্টা কেন্দ্রে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে বোর্ড ও মিশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম অ্যাডভেন্টিস্ট মিশন স্কুলের অধ্যক্ষ নিউটন ব্যাপারি বলেছেন, ‘শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী সকালে তারা নির্ধারিত সময়ে হলে প্রবেশ করে কক্ষে বসে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করবে। শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা কেন্দ্র থেকে করার কথা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা তাদের টাকা দিয়ে দেব।’
তবে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়েছেন, খাবারের ব্যবস্থা শিক্ষার্থীরা নিজেরাই করবেন।
সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট ও সাবাথ কী : প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টধর্মের একটি বিশেষ শাখা হলো ‘সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট’ মণ্ডলী। যার অনুসারীরা বাইবেলের প্রাচীন বিধান মেনে রবিবার নয়, বরং সপ্তাহের সপ্তম দিন শনিবারকে তাদের পবিত্র বিশ্রামবার বা ‘সাবাথ’ হিসেবে পালন করেন। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, শুক্রবার সূর্যাস্ত থেকে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টুকু সম্পূর্ণ পবিত্র। এই সময়ে ঈশ্বর আরাধনা ও সম্পূর্ণ বিশ্রাম ছাড়া অন্য যেকোনো ধরনের পার্থিব কাজ, পড়াশোনা বা পরীক্ষা দেওয়া সম্পূর্ণ ধর্মীয় নিয়মের পরিপন্থী, জানালেন বাংলাদেশ অ্যাডভেন্টিস্ট ইউনিয়ন মিশনের শিক্ষা পরিচালক জন রায়।




