হায়রে চট্টগ্রাম!
মাস্টারপ্ল্যানের ৮০ ভাগ হয়নি বাস্তবায়ন

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম শহরকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে আগামী ২৫ বছরের জন্য নতুন মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) প্রকাশ করা হয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনা তৈরিতে যতটা এগিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), বাস্তবায়নে ঠিক ততটা পিছিয়ে। তিন দশক আগে তৈরি করা মহাপরিকল্পনার অধিকাংশই বইয়ের পাতায় পাতায় বন্দি। নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ বছর পরপর মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনার কথা থাকলেও গত ৩০ বছরে একবারও করা হয়নি।
জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেছেন, ‘অতীতে কী হয়েছে, তা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। ভবিষ্যতের জন্য একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সে চেষ্টার অংশ হিসেবেই নতুন মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে।’
১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য প্রণীত ‘চট্টগ্রাম মহানগরী মহাপরিকল্পনায় (২০২৫-৫০)’ নগর পরিবহন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নতুন উপশহর তৈরিসহ ছয়টি উপপরিকল্পনা যুক্ত। কিন্তু ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান এবং ২০০৮ সালের ড্যাপ তুলে ধরছে ভিন্ন এক চিত্র। নতুন মাস্টারপ্ল্যানের তথ্য বলছে, অতীতে বাস টার্মিনাল, রাস্তার মোড় উন্নয়ন কিংবা রেলওয়ের ওভারব্রিজের মতো জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের ৮০ শতাংশের বেশি কাজই হয়নি। এমনকি ড্যাপ উপেক্ষা করে নগরের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষিত কৃষিজমিও আবাসন ও বাণিজ্যিক দখলে হারিয়ে গেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পুরনো ব্যর্থতা না শুধরে ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে নতুন খসড়া অনুমোদন দিলে এই বিশাল মাস্টারপ্ল্যানও শেষ পর্যন্ত নথিপত্রের ভাঁজে হারিয়ে যাবে।
সিডিএর খসড়া মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগের মাস্টারপ্ল্যান ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই কাগজ-কলমে বন্দি ছিল। সড়ক উন্নয়ন খাতের ২৩ প্রকল্পের মধ্যে ২০টি (৮৭ শতাংশ) শেষ হয়েছে। কিন্তু মূল সংযোগ সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ১৩টির মধ্যে মাত্র পাঁচটি (৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ) বাস্তবায়িত হয়েছে।
প্রস্তাবিত সাতটি বাস টার্মিনালের মধ্যে শুধু বহদ্দারহাটে একটি (১৪ দশমিক ৩ শতাংশ) নির্মিত হয়েছে। মোড় বা ইন্টারসেকশন উন্নয়নের হার ছিল আরও কম। ১৫ প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র একটি (৬ দশমিক ৭ শতাংশ) বাস্তবায়ন হয়েছে। তা ছাড়া ১৯৯৫ সালের পরিকল্পনায় থাকা ১১টি রেলওয়ে ওভারব্রিজের একটিও গত তিন দশকে আলোর মুখ দেখেনি।
আগের মাস্টারপ্ল্যানের ব্যর্থতার পেছনে প্রধানত সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাসহ সেবা সংস্থাগুলোর কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। কম দৃশ্যমান কিন্তু জরুরি প্রকল্পের বদলে দৃশ্যমান ফ্লাইওভার নির্মাণে নজর দেওয়া। কারিগরি ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি। নির্দিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের অভাব। চিহ্নিত এসব কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ এখনো চরমে।
এ অবস্থায় নতুন ২০২৫-৫০ মহাপরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় বিশেষজ্ঞদের। ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি), চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেছেন, ‘এবারের মাস্টারপ্ল্যান অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে এটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য একক কর্তৃত্ব জরুরি। যার জন্য ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ বা নগর সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা প্রয়োজন, যাতে একই জায়গা থেকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়িত হতে পারে। পাশাপাশি সিডিএকে সংস্কার করা দরকার। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি মাস্টারপ্ল্যান বা নগর পরিকল্পনার চেয়ে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেই বেশি জোর দেয়। এজন্য সিডিএর নাম পরিবর্তন করে ‘চট্টগ্রাম প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ করা উচিত। যেন পরিকল্পনার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। পাশাপাশি নতুন এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো এটি বাস্তবায়ন করা দুরূহ হয়ে পড়বে।’
আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেছেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল কাজ সিডিএর ছিল না; কিন্তু তারা সে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। এক দশক ধরে এ কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। এতে সিডিএর মূল কাজ অর্থাৎ নগর পরিকল্পনা প্রস্তুত ও তা অনুসরণের বিষয়টি পুরোপুরি থমকে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের পরিধি বহুগুণ বাড়লেও ১৯৮২ সালের পুরনো জনবল কাঠামো দিয়েই এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সিডিএ। এমনকি সেই সামান্য পদগুলোরও বড় অংশ ফাঁকা। এভাবে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে শুধু নতুন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করলে তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।’




