দুই পুলিশ সাসপেন্ড, বিভাগীয় মামলা; ক্রিকেটার নাঈমের সঙ্গে কী ঘটেছিল…

জাতীয় দলের স্পিনার নাঈম হাসান পুলিশি হেনস্থা ও মারধরের শিকার হওয়ার পর এখন নগরের বহদ্দারহাটের ফরিদার পাড়ার বাড়িতে রয়েছেন। তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। সারা রাত থানায় কাটাতে হয়েছে তাকে ও স্বজনদের। ভোররাতের দিকে তিনি বাসায় ফিরেছেন।
এই ঘটনায় পুলিশের এস আই (নিরস্ত্র) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ।
তিনি বলেছেন, তিনজন নয় দুই পুলিশ জড়িত নাঈমকে হেনস্থার ঘটনায়। দুজনকে সাসপেন্ড করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই ঘটনার পর আজ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে নাঈম হাসানের বাসায় গেছেন পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী। এ সময় তিনি নাঈম ও তার বাবা মাহবুব হাসানের সঙ্গে কথা বলেন। দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির আশ্বাস দেন।
কী ঘটেছিল-
নাঈমের সঙ্গে শুক্রবার কী কী ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন নাঈম হাসান ও থানায় তার সঙ্গে থাকা নাঈমের বড় শ্যালক আবেশ খান। পুলিশের এমন ঘটনায় নাঈম হতবাক ও কিছুটা বিপর্যস্ত। নাঈমের বাবা মাহবুব আলম বিএনপি নেতা, তিনি একসময় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। তিনি ও নাঈমের বড় ভাই সাব্বিরও থানায় ছিলেন। নাঈম হাসান থানায় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
নাঈম জানান, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তিনি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ওঠেন। তিনি প্রিমিয়ার লিগ খেলে ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রাম ফেরেন। তার অটোরিকশাটি ফ্লাইওভার থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ সংকেত দেয়।
নাঈম বলেছেন, তারা আমাকে কোনো ধরনের পরিচয় না দিয়ে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে গাড়ির ডকুমেন্ট ছিনিয়ে নেন। একপর্যায়ে তারা আমার গলা চেপে ধরে জোর করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা করে।
নাঈম পুলিশের কাছে কেন হেনস্থা করা হচ্ছে জানতে চাইলে আরও ক্ষিপ্ত হয় পুলিশ, ‘আমি জানতে চেয়েছিলাম কেন আমাকে এমন করা হচ্ছে। তখন আমাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। সেখানে দুইজন পুলিশ সদস্য ছিলেন বলে পরে জানতে পারি। তাদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পরা আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নিজেও আমাকে মারধর করেন।’
নাঈম ফোনে তার বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত হয়। ‘আমি আমার বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম। তখনও আমার গলা চেপে ধরে। আমি চিৎকার করলে আশপাশের মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেন। প্রায় একশ থেকে দেড়শ মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। অনেকেই আমার পরিচয় জানার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন।’
নাঈম নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ‘আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি, আইডি কার্ড দেখিয়েছি। তারপরও তারা আমাকে ‘আসামি’ বলে সম্বোধন করে এবং কথা বলতে নিষেধ করে। আমাকে পরে পুলিশ আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে থানায় নেয়। সেখানে আমাকে বলা হয়, নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে। পরে কারো ফোন আসার পর তাদের আচরণ বদলে যায় এবং আমাকে বসতে বলা হয়।’
ক্রিকেটার নাঈম বলেছেন ‘মানুষ আমাকে চিনত বলে আমি আজ বেঁচে গেছি। আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে তার কী হতো? তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হতো, সেটি কেউ জানত না। একজন সাধারণ নাগরিক যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।’
নাঈমের বাবা মাহবুব আলম জানান, পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় আসি। ডিউটি অফিসার আমারে প্রথমে থানাতেই ঢুকতে দেননি। দূরে গিয়ে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় ঢুকতে দেয়।
‘থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও আমার ছেলেকে অপমান করে কথা বলেছেন ওসি। পরে ঢাকা থেকে তামিম ইকবাল, ইসরাফিল খসরুর ফোন পেয়ে পুলিশ নমনীয় হয় এবং ভুল স্বীকার করে। জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি চাই।’
নাঈমের স্ত্রীর বড় ভাই আবেশ খান শনিবার সকালে আগামীর সময়কে জানান, পুলিশ তল্লাশি করতেই পারে। কিন্তু ব্যাগ তল্লাশি না করে শারীরিকভাবে হেনস্থা কোনোভাবে কাম্য নয়। চোরাচালানের কিছু যদি থেকেই থাকে তাহলে ওই ব্যাগ নাঈমকে বহনকারী সিএনজিতে রেখে আরেকটি সিএনজিতে কেন নাঈমকে থানায় নিয়ে গেল?
আবেশ বলেছেন, আমি ডিসির (পুলিশের ডিসি নর্থ আমিরুল ইসলাম) সামনেই তাদের রাত ৪টার সময় আমি প্রশ্ন করলাম, তখন সঠিক জবাব দিতে পারেনি। আপনার পুলিশের যদি ইল মোটিভ না থাকে, তাহলে সে পুলিশ ব্যাগ চেক করলো না কেন? চেক না করে তাকে (নাঈম) কেন অপহরণের চেষ্টা করলো?
আবেশ জানান, পুলিশকে ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। পুলিশকে সে আইডি কার্ডও দেখিয়েছে। সবকিছু দেখানোর পরেও সিএনজিওয়ালার কথাও পুলিশ শুনতে নারাজ। নাঈমকে গলা চিপে ধরে হচ্ছে অন্য সিএনজিতে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাঈমকে বহনকারী সিএনজিওয়ালাও শেষপর্যন্ত থানায় ছিল। তিনিও পুলিশের হেনস্থার বর্ণনা দিয়েছেন।
আবেশ জানন, পুলিশের সাথে সিভিল পোশাকে একজন ছিল। ওই ব্যক্তিও লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে। জনগণ তাকে ধাওয়া করেছিলো। পরে ওই ব্যক্তি আবার থানায় গেছে। এসআইদের সাথে তার যদি কোনো কানেকশন না থাকে তাহলে সে থানায় কীভাবে যায়।
আবেশ বলেন, আমরা আইনের প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী। তাই মামলা করেছি পুলিশের বিরুদ্ধে। তিনজকে আসামি করেছি আমরা। তারা হলেন এসআই শফিক, কনস্টেবল রাসেল ও সোহেল।
নাঈম সারারাত ঘুমায়নি জানিয়ে আবেশ বলেন, নাঈম এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। তিনি কিছুটা বিপর্যস্ত ও হতবাক।







