পোষাপ্রাণীর কেনাবেচায় জনপ্রিয় দেওয়ানহাট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেওয়ানহাট মোড়ের ফ্লাইওভারের নিচ থেকে কর্পোরেশন কলেজের সামনের রাস্তা। এক পাশে ছোট-বড় খাঁচা নিয়ে হাজির লোকজন। খাঁচার মধ্যে বন্দি পাখি, বিড়াল, খরগোশ, হাঁস-মুরগিসহ নানান প্রাণী। এটা একটা পোষা প্রাণীর হাট। প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার দুপুর ১ টা থেকে এখানে বসে বিচিত্র এ হাট।
এই পাখির হাট এখন শুধু একটি বাজার নয়, পোষা প্রাণী প্রেমীদের মিলনমেলাও। এই হাটে ভিড় জমান নানা বয়স ও পেশার মানুষ। কেউ আসেন পাখি কিনতে, কেউ বিক্রি করতে, আবার কেউ শুধু পাখি দেখতে। নানান রঙের বর্ণের বিচিত্র্য এসব প্রাণী। কোনটি দেখে চোখ জুড়ায়। আবার কোনটির শব্দ শুনে আনন্দ লাগে।
দুপুর গড়াতেই শুরু হয় হাটের জমজমাট আয়োজন। খাঁচায় খাঁচায় সাজানো নানা জাতের পাখি। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের পাখির সাথে আছে হাঁস, মুরগি। নাম ব্রাহমা, সিল্কি, সরাইল। পার্সিয়ান বিড়াল, রাগডল বিড়াল, মিক্স বিড়াল। আছে খরগোশও।
চট্টগ্রাম শহরের পাশাপাশি সন্দ্বীপ, রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাখিপ্রেমী মানুষ ছুটে আসে এই হাটে।
বিক্রেতা খুরশিদ বললেন, ‘পানের দোকান করি আমি। দোকানের এক পাশে শখের বসে এগুলা (পাখি) প্রতিপালন করি। আজ দুইটা কবুতর আর একটা বাচ্চা নিয়ে এসেছি বিক্রি করতে।’
দেওয়ানহাটের পাখির হাট মূলত কবুতরের জন্যই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এখানে দেখা মেলে পাকিস্তানি কবুতর, গিরিবাজ, রেসার, সবজি রেসার, গোয়াসলা, হোমা, ময়না ও গুবলসহ বিভিন্ন জাতের কবুতর। অনেকেই তাদের সংগ্রহের বিশেষ জাতের কবুতর নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য।
হাটে আসা বিক্রেতা মুরাদ জানালেন, এখানে প্রায় ৮-১০ জাতের কবুতর আছে। একেকটির একেক বৈশিষ্ট্য।
১৪ বছর ধরে এই হাটে কবুতর বিক্রি করেন খোরশেদ আলম। তিনি জানালেন, দেশি গিরিবাজ জোড়া ৬৫০ থেকে ৭০০, মৌয়ুর জোড়া ১৫০০, হোমা ২৫০০ থেকে ৩ হাজার, লাহোর ২ হাজার থেকে ১০ হাজার, সিরিয়ান ডিউলিপ জোড়া ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার।
ক্রেতা আরফাত সানি বললেন, ‘সন্দ্বীপ থেকে আসার কারণ হচ্ছে এখানে ভালো ভালো কবুতর পাওয়া যায়। বাসায় আছে ৭ জোড়া কবুতর। আজও এক জোড়া কবুতর কিনে নিয়ে যাচ্ছি।‘
কবুতরের পাশাপাশি এই হাটের অন্যতম আকর্ষণ বিদেশি পাখি। ছোট্ট বাজরিগার থেকে শুরু করে রঙিন লাভবার্ড, কোকাটেল, রিংনেক, ফিঞ্চ, জাভা, গ্রিন চেক কনুর, পাইনঅ্যাপেল কনুর সবই পাওয়া যায় এখানে। বিশেষ করে লাভবার্ড ও কোকাটেল এখন শহুরে পরিবারগুলোর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিক্রেতারা জানান, আগের তুলনায় এখন বিদেশি পাখির চাহিদা অনেক বেড়েছে। অনেকে ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে পাখি পালে। আবার কেউ কেউ এটিকে শখ থেকে ব্যবসায় রূপ দিয়েছেন।
পাখি বিক্রেতা মোহাম্মদ বাদশা বাদল জানান, সান কনিউর পাখি প্রতি জোড়া ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার, রিংনেকের দাম ৩৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা জোড়া, লাভবার্ড বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। কনুর ও কোকাটেল জোড়া ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা।
সবচেয়ে বেশি দামি পাখির তালিকায় রয়েছে ম্যাকাও। এসব পাখির একটি জোড়ার মূল্য তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। সাধারণ ক্রেতাদের চেয়ে সংগ্রাহক ও শৌখিন খামারিদের কাছেই এসব পাখির চাহিদা বেশি। তবে এদিন বাজারে ম্যাকাওয়ের দেখা মেলেনি।
জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে এবং শিশুদের বিনোদনের জন্য পাখি কেনাবেচা ও লালনপালন এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।
ক্রেতা মোহাম্মদ ফারুক বললেন, ‘আমার বাচ্চারা একটা তোতা পাখি পুষতো। সেটি মারা যাওয়ার পর তারা কান্নাকাটি করছে। তাই আবার নতুন পাখির জন্য এলাম।'
শৌখিন ক্রেতা বাবলুর ভাষ্য, পাখি আমরা পুষি মূলত বিনোদনের জন্য। শহরের যানজটের মধ্যে পাখির ডাক শুনতে ভালো লাগে। ওদের দেখলে নিজেকে অনেক ফ্রেশ লাগে।'
বিভিন্ন পাখি ছাড়াও বড় খরগোশ জোড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা, বাচ্চা খরগোশ জোড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রাহমা জাতের মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকায়। সিল্কি মুরগির দাম জোড়া ৩ হাজার ২০০ টাকা। পার্সিয়ান বিড়ালের জোড়া ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা।
পাখি কেনার উদ্দেশ্য সবার এক নয়। কেউ সংগ্রহ করেন শখে, কেউ ব্যবসার জন্য, আবার অনেকেই কিনছেন মানসিক প্রশান্তির আশায়।




