১২০০ যাত্রীর ১১ হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট করল চট্টলা এক্সপ্রেস

সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামগামী ও ঢাকাগামী আন্তনগর ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ ট্রেনে চরম সিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দিনে ট্রেনটি আপ-ডাউন মিলিয়ে মোট ৯ ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করেছে। এতে ট্রেন দুটির অন্তত ১ হাজার ২০০ যাত্রীর প্রায় ১০ হাজার ৮০০ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে।
তীব্র গরমে স্টেশনে ও ট্রেনের ভেতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের অব্যবস্থাপনার কারণে এই বিলম্ব। এটি মানুষের সময়ের গুরুত্ব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার শামিল।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই বিলম্বের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ দেখাতে পারছেন না। একেক কর্মকর্তা একেক ধরনের অজুহাত দিচ্ছেন। তবে জানা গেছে, মূলত জরাজীর্ণ ইঞ্জিন বিকল হওয়া, তীব্র ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) সংকট এবং বিভিন্ন স্টেশনে ক্রসিংয়ের জন্য অতিরিক্ত সময় বসিয়ে রাখার কারণেই এই সিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। শুধু এই দুইদিন নয়, এপ্রিল মাসে পথে পথে ২৮টি ইঞ্জিন বিকল হয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে। এতে ট্রেনগুলো গন্তব্যে পৌঁছাতে ৭২ ঘণ্টা বিলম্ব করেছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেন চট্টগ্রামে পৌঁছায় গভীর রাত দেড়টায়। অথচ ট্রেনটির চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল রাত সাড়ে আটটায়। ট্রেনটি বিলম্ব করে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। ট্রেনটিতে আসন সংখ্যা ৬৩৫। গড়ে ৬০০ জন যাত্রী থাকলেও তাদের মোট ৩ হাজার ৩০০ ঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ট্রেনটির নির্ধারিত যাত্রা সময় ৬ ঘণ্টা ১৫ মিনিট হলেও এটি গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যয় করেছে প্রায় সাড়ে ১১ ঘণ্টা।
আজ বুধবার সকাল ৬টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে চট্টলা এক্সপ্রেসে। ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে। এটি ঢাকায় পৌঁছায় বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে। ট্রেনটি প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বিলম্ব করে। এতে ৬০০ যাত্রীর মোট ২ হাজার ১০০ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। দুইদিনে নষ্ট হয়েছে ১০ হাজার ৮০০ ঘণ্টা। ট্রেনটি বিকালেও ঢাকা থেকে ছেড়েছে দুই ঘণ্টা বিলম্বে।
ঠিক সময়ে ঢাকায় পৌঁছাতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জোবায়ের হোসেন নামে এক যাত্রী। বলেছেন, ‘ঢাকায় কাজ থাকায় চট্টলা এক্সপ্রেসে টিকিট কেটেছিলাম। ভেবেছিলাম দুপুরে কাজ সেরে রাতে আবার ফিরে আসবো। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিনঘণ্টা বিলম্বে এটি ঢাকা পৌঁছায়। যার কারণে আমাকে আরও একদিন ঢাকায় থাকতে হবে।’
তিনি এসি বগিতে দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, ভিক্ষুক ও হকারের উৎপাতসহ অব্যবস্থাপনা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বিলম্বের কারণ জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আগামীর সময়। তাদের কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তাদের একজন বলেছেন, ‘মঙ্গলবার পথে দুইটি ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। যার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সময়সূচি ভেঙে পড়েছে। তাছাড়া তীব্র ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। একই ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পর, সেই ইঞ্জিন ঘুরিয়ে আবার ফিরতি ট্রিপের ট্রেনের সঙ্গে জুড়তে জুড়তে অনেক সময় চলে যাচ্ছে। ফলে শুরুর স্টেশন থেকেই ট্রেন ছাড়তে দেরি হচ্ছে।’
অন্য একজন কর্মকর্তা জানান, চট্টলা এক্সপ্রেসের স্টপেজ বা যাত্রাবিরতির সংখ্যা অন্য আন্তঃনগর ট্রেনের চেয়ে বেশি। বিভিন্ন স্টেশনে ক্রসিংয়ের জন্য ট্রেনটিকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। যার কারণে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হয়।
ট্রেনটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে ১৪টি স্টেশনে যাত্রা বিরতি করে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. স্বপন কুমার পালিত বলেছেন, ‘রেলওয়ের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো, তারা যাত্রীদের এই চরম ভোগান্তি এবং সময় নষ্ট হওয়াটাকে একটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত করেছে। উন্নত বিশ্বে ট্রেন ১ মিনিট দেরি করলে যেখানে করজোড়ে ক্ষমা চাওয়া হয় এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, সেখানে আমাদের দেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব হওয়াকে রেল কর্তৃপক্ষ এক ধরনের উদাসীন এবং দায়সারাভাবে নিয়ে থাকে।’
‘গরমে সিদ্ধ হয়ে, স্টেশনে মশার কামড় খেয়ে যাত্রীরা যে কষ্ট পাচ্ছেন, সেই মানবিক দিকটি রেলের নীতিনির্ধারকদের স্পর্শই করে না।’




