১৮ হাজার টাকা টিকিটে লালদীঘিতে মাছ শিকারের ধুম

লালদীঘিতে বড়শিতে মাছ শিকার করছেন শিকারিরা। ছবি: রনি দে, চট্টগ্রাম
নিয়ন আলোর এক চিলতে হলুদ আভা ঠিকরে পড়েছে লালদীঘির শান্ত জলে। সেই আলোর ঠিক মাঝখানে ভাসছে ছোট এক টুকরো শোলার ফাৎনা। মাচায় বসে থাকা শিকারির শরীর ধনুকের মতো টানটান। চোখের পাতা পড়ছে না। শিকারির পুরো দৃষ্টি তখন আটকে গেছে ওই শোলাতে।
হঠাৎ এক মৃদু কাঁপুনি। ফাৎনাটা কেঁপে উঠে এক মিলিমিটার ডুবল। শিকারির বুকের ভেতর হাতুড়িপেটার আওয়াজ। এটা কি তলদেশের কোনো চুনোপুঁটির গুঁতো, নাকি বড় কোনো মাছ। টুপ করে ফাৎনাটা অতলে হারিয়ে যেতেই শিকারি দুই হাতে ছিপ তুললেন আকাশের দিকে! বড়শির ইস্পাত বিঁধল মাছে। অমনি সাবমেরিনের মতো জলের গভীরে মোচড় দিল এক অদৃশ্য শক্তি। রিলের সাঁইসাঁই শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা চুরমার করে মাচা থেকে চিৎকার উঠল, ধরেছে রে, ধরেছে! সুতো ছাড়, সুতো ছাড়! শুরু হলো মানুষ আর জলের মাছের লড়াই।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘিতে এভাবে বড়শিতে মাছধরায় মেতে উঠেছেন একদল শৌখিন মাছ শিকারি। শতবর্ষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল লালদীঘি ও সংলগ্ন মাঠটি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা কিংবা একাত্তরের উত্তাল দিনগুলো সবকিছুর মুখরিত সাক্ষী এই প্রাঙ্গণ। শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলারও সাক্ষী এই লালদীঘির ময়দান। সেই লালদীঘির বুক চিরেই শুক্রবার রাত দশটা থেকে শনিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত হয়ে গেল মাছধরা উৎসব।
আয়োজন সংশ্লিষ্ট হায়দার আলী বললেন, ‘কয়েক মাস আগে সিটি করপোরেশন থেকে ইজারা নিয়ে দিঘিতে প্রায় বিভিন্ন সাইজের ৩০ মণ মাছ ছেড়েছিলেন মোহাম্মদ আলম গং। অন্য একটি জলাশয় থেকে এনে লালদীঘিতে ছাড়া হয়েছিল মাছগুলো। ওই মাছ এখন আরও বড় হয়েছে। সেই মাছগুলো শিকারেই চারপাশ ঘিরে তৈরি করা হয় ১৮টি মাচা। প্রতিটি মাচায় চারজন করে বসার সুযোগ, আর টিকিটের দাম ১৮ হাজার টাকা।
শিকারিদের এই লড়াইয়ে বড়শির চেয়েও বড় ছিল টোপের রসায়ন। কাতলা মাছকে টানতে কেউ মেখেছেন সুগন্ধি লাড্ডু, রুই-মৃগেলের জন্য বানিয়েছেন সাদা রুটি আর পিঁপড়ার ডিমের চারা, আবার পাঙাশ শিকারে ছিল ভিন্ন উপাদান। সেই অপেক্ষার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। দিঘিতে সর্বনিম্ন এক-দেড় কেজি থেকে সর্বোচ্চ ১৫ কেজি পর্যন্ত মাছ ছিল। খালি চোখে যেটাকে ১২ কেজি মনে হয়েছিল, দাঁড়িপাল্লায় তুলে দেখা গেল ১৪ কেজির এক ব্ল্যাক কার্প! এছাড়া বড়শিতে উঠেছে ১১ কেজির বেশি ওজনের কাতলা, ৫ কেজির পাঙাশসহ ঝাঁকে ঝাঁকে রুই ও মৃগেল। অনেকের মাচায় জমা হয়েছে এক মণেরও বেশি মাছ।
মাছ শিকারের এই রোমাঞ্চ দেখতে দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত কৌতূহলী মানুষ। বকশির হাটের বাসিন্দা এবং দীর্ঘ ৩৫-৩৬ বছর ধরে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত থাকা মোহাম্মদ টিপু জানালেন, তার মাছ শিকারের হাতেখড়ি হয়েছিল এই লালদীঘির পানিতেই। চুয়েটের কর্মকর্তা রিয়াদ কিংবা তরুণ উদ্যোক্তা আরাফাত হোসেনের মতো শিকারিরাও এসেছিলেন কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে।
কোনো মেডেল বা ট্রফির জন্য এই প্রতিযোগিতা নয়, এটি ছিল আত্মার খোরাক মেটানোর এক অনন্য মিলনমেলা। ব্যস্ত নগরের ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি জীবনে জলের দিকে স্থির দৃষ্টি মেলে একফোঁটা রোমাঞ্চ খোঁজার প্রচেষ্টা।






