এনআইডিতে ভুল
মায়ের নাম সংশোধন করতেই ৯ বছর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মোছাম্মৎ রেহেনা আকতারের জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) তার মায়ের নাম ভুল। প্রকৃত নাম জয়নাব বেগম। কিন্তু এনআইডিতে হয়ে গেছে ‘মাসুদা কাসেম হাওলাদার’। তার সব ভাইবোনের এনআইডিতেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি। পর্যায়ক্রমে নিজের ও ভাইবোনদের এনআইডি সংশোধন করা হয়।
রেহেনার বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। কিন্তু বিবাহসূত্রে চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা তিনি। এনআইডি সংশোধনের জন্য দুই মাস আগে অনলাইনে আবেদন করেন চট্টগ্রামে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে বিষয়টি তদন্তে পাঠান। পটিয়ার তদন্ত প্রতিবেদনের পর মায়ের ঠিকানা মুন্সীগঞ্জের নির্বাচন কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন লাগবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মুন্সীগঞ্জ থেকে এক মাসেও ওই তদন্ত প্রতিবেদন চট্টগ্রামে পৌঁছায়নি।
গত মঙ্গলবার দুপুরে রেহেনার ভাই মোহাম্মদ জুলহাস চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে গিয়ে হতাশ হন। জুলহাস আগামীর সময়কে বললেন, ‘এ পর্যন্ত কয়েকবার জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে লেফট-রাইট করেছি। বোনের এনআইডিতে মায়ের নামটি সংশোধন কোনোভাবে হচ্ছে না। অথচ ঢাকায় নির্বাচন কমিশনে শুনানির মাধ্যমে মায়ের এনআইডিতে নিজের নামটি সংশোধন করা হয়। যদিও ৯ বছর লেগেছে ওই এনআইডি সংশোধন করতে। মায়ের এনআইডি সংশোধনের পর অন্য বোনদের এনআইডি সংশোধন হয়ে গেছে। কিন্তু রেহেনার এনআইডি সংশোধন করতে পারছি না।’
এটা হলো নির্বাচন কার্যালয়ে এনআইডি নিয়ে সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির একটি নমুনা মাত্র। অথচ কম্পিউটারের সামনে বসে অনলাইনে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার নিয়ম চালু করা হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। সাধারণকে বহুমাত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হলেও রোহিঙ্গাদের টাকা দিয়ে সহজেই এনআইডি, এমনকি পাসপোর্ট পর্যন্ত করে ফেলার অসংখ্য ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রকৃত নাগরিকদের যে কী পরিমাণ ঝামেলায় পড়তে হয়, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
হয়রানি করা হয় না দাবি করে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানালেন, ‘কিছু সংশোধনী আছে খুব দ্রুত সময়ে হয়ে যায়। ‘খ’ বা ‘গ’ ক্যাটাগরির সংশোধনীর জন্য অনেক কিছু যাচাই-বাছাই করতে হয়। তদন্তে পাঠাতে হয়। এজন্য কিছুটা সময় লাগে।’
এনআইডিতে একেকজন একেক ধরনের ভুল সংশোধন নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সংশোধনের দীর্ঘসূত্রতা এবং হয়রানির অভিযোগ নিত্যদিনের। বর্তমানে জেলা কার্যালয়ে প্রায় তিনশ সংশোধনী অমীমাংসিত রয়েছে অনেক দিন ধরে।
দেশের প্রতিটি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের সবচেয়ে বড় রুটিন কাজ এনআইডি সংশোধন করা। বিশেষ করে ২০০৭-০৮ সালে এনআইডি প্রবর্তন করা হয়। তখনই নানা ভুলে ভরা যেনতেনভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। কারও নিজের নাম ও বয়স ভুল, কারও মা-বাবার নামের বানান কিংবা ঠিকানায় ভুল। এতে পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, জমির রেজিস্ট্রেশন, বিদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিদেশি ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
সাধারণত থানা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে সংশোধনীগুলো করা হয়। সাধারণ যেসব সংশোধনী তা ‘ক’ ক্যাটাগরিতে পড়ে। এগুলো থানা কর্মকর্তারা করে দেন। জেলা কার্যালয়ের অধীনে থাকে একটু জটিল সংশোধনী, যা ‘খ’ ক্যাটাগরি নামে পরিচিত। ‘গ’ ও ‘ঘ’ ক্যাটাগরির সংশোধনী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় ও ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হয়।
বন্দর এলাকার বাসিন্দা সুমন দাশের এনআইডি হয় ২০০৮ সালে। তখন তার এনআইডিতে নামের পদবি পড়েনি। এনআইডিতে পদবি ‘দাশ’ যুক্ত করার জন্য দুই মাস আগে আবেদন করেছেন তিনি। কিন্তু গত মঙ্গলবার কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন সংশোধন আবেদনটি বাতিল হয়ে গেছে। কেন? সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাননি তিনি। কর্মকর্তারা বলছেন, এ সংশোধনে আবেদনের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের এনআইডির অনুলিপি জমা দিতে হবে। সেগুলো যথাযথভাবে করা হয়নি। তাই অনলাইনে আবেদন বাতিল হয়েছে। তাকে আবার একইভাবে আবেদন করতে হবে।
সুমনের স্ত্রী জানালেন, ‘শুধু পদবি নয়, স্বামীর বয়সও ১৯৮২-এর জায়গায় এসেছে ১৯৮৮। আমার চেয়ে স্বামীর বয়স কম! এখন ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তার রেজিস্ট্রেশনে বাবার নাম পদবি লাগছে। এনআইডিতে ভুল থাকায় তা দেখানো যাচ্ছে না। তাই সংশোধন করতে এসেছি। একবার বাতিল হওয়ায় আবার আবেদন করতে হবে। বয়স সংশোধনের জন্য এসএসসি সনদ দরকার। কিন্তু সুমন এসএসসি পর্যন্ত পড়েননি। তাই বয়সটা আপাতত সংশোধন জটিল। এজন্য তারা শুধু নামের পদবিটা আপাতত যোগ করতে চান।
মঙ্গলবার দুপুরে নির্বাচন কার্যালয়ের চতুর্থতলা থেকে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ নিয়ে নেমে আসছিলেন কুলছুম আকতার। সঙ্গে তার ছেলে মোহাম্মদ রাসেল। হালিশহরের এই বাসিন্দার জন্ম ১৯৭৭ সালে। তার এনআইডিতে কোনো ভুল ছিল না। কিন্তু এনআইডি সার্ভারে কুলছুমকে মৃত দেখানো হচ্ছে! তাই হালিশহর থেকে ছুটে আসেন ছেলেকে নিয়ে। কী হয়েছে জানতে চাইলে কুলছুম অবাক হয়ে আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি নাকি মারা গিয়েছি। সার্ভারে মৃত দেখাচ্ছে। এজন্য আসছিলাম। ৪০৪ নম্বর কক্ষে কর্মকর্তা আমাকে দেখে বললেন, একটা আবেদন জমা দিতে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সনদসহ আবেদন জমা দিতে হবে।’
ছেলে রাসেল যোগ করলেন, ‘আনসার নামে কোনো এক ব্যক্তি নাকি লিখিতভাবে জানিয়েছেন, আমার মা মারা গেছেন। কিন্তু বাইরের লোকের আবেদনে কীভাবে এটা সার্ভারে মৃত হিসেবে রেকর্ড হলো, তা বোঝা গেল না।’
এ বিষয়ে নির্বাচন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বললেন, ‘কুলছুমেরটা কোনোভাবে ভুল হয়ে গেছে। কীভাবে হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
সংবাদকর্মীর কাছে খতিয়ে দেখার অজুহাত দিয়ে গা বাঁচাতে চাইলেও নির্বাচন কার্যালয় অফিসে প্রতিদিন যে শত শত মানুষ আসছেন, তাদের চোখ-মুখে উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা ফুটে উঠছে। আর নির্বাচন কার্যালয় ভবনের ওপর-নিচ করতে করতে শরীর বেয়ে ঘাম ঝরতে দেখে বোঝা যায় কী পরিমাণ হয়রান হচ্ছেন তারা।



