অন্তর্বর্তীর চুক্তিতে বিপদে দুই বন্দর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ নামে যে রানওয়ে দিয়ে, সেটি কর্ণফুলী নদীর তীরে। এর গা ঘেঁষে মাত্র ২৫০ মিটার দূরে বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে উঠছে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি)। রানওয়ের এত কাছে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের টার্মিনাল নির্মিত হচ্ছে— ভবিষ্যতে এ বিমানবন্দর সম্প্রসারণের সুযোগ আর থাকছে না।
আবার টার্মিনাল চালু হলে পণ্য ওঠানামায় ব্যবহৃত কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের উচ্চতায় উড়োজাহাজ চলাচলে ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি হতে পারে। এর ফলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়বে আবার লালদিয়া কর্তৃপক্ষও আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন বসাতে পারবে না। তাই লাভের কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এক উন্নয়ন আরেক উন্নয়নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে—এমনটাই মন্তব্য বিশ্লেষকদের। সরকারি পরিসংখ্যানে চট্টগ্রাম শহরের জনসংখ্যা ৫৮ লাখ। কিন্তু বাস্তবে ৭০ লাখ ছাড়িয়ে। এখন বছরে জনসংখ্যা বাড়ছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ হারে। শিল্পায়ন, কর্ণফুলী টানেলকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা ইকোনমিক জোন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ঘিরে বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
অর্থনীতির বাড়তি চাপ সামাল দিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যানে বিমানবন্দর এলাকাকে একটি মাল্টি-মোডাল হাব বাস্তবায়নের সুপারিশ করা আছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে দুই প্রান্তের ‘অ্যাপ্রোচ পাথ’ এবং ফানেল এলাকার নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে যেকোনো ধরনের বহুতল ভবন, মোবাইল টাওয়ার বা উঁচু কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সিডিএ’র নকশা অনুমোদনের আগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, উড়োজাহাজ চলাচলের এত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য ওঠানামার টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তির আগে কেন ঝুঁকি যাচাই করা হয়নি।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘চট্টগ্রামের উন্নয়নে আসলেই সামগ্রিক চিন্তা নেই। সেটা আমরা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দেখেছি, এখন আবার দেখছি বন্দরে। যে যার মতো করেই প্রকল্প নিচ্ছে, সেখানে বিমানবন্দরকে রাখছে না। এমনভাবে প্রকল্প নিতে হবে, যাতে সাংঘর্ষিক না হয়।’
ডেনমার্কভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালস এই গ্রিনফিল্ড এলসিটি টার্মিনাল প্রকল্পে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করবে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে করা চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ সালে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষর করা চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। অসন্তোষ আছে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এর নকশা প্রণয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ করে টার্মিনাল চালু হবে ২০৩০ সালে। এরপর ৩৩ বছর মেয়াদ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এলসিটি পরিচালনা করবে। এলসিটিতে এখনো অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়নি। তার আগেই ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি হলো।
ঝুঁকির কারণ হচ্ছে, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ে পূর্বপ্রান্তের অ্যাপ্রোচ থেকে অন্তত ৪০০ মিটার দূরে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের সময় পাইলিংয়ে ব্যবহৃত উঁচু টাওয়ারের কারণে উড়োজাহাজ চলাচল ঝুঁকিতে পড়েছিল। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে তখন নিচু টাওয়ার বসিয়ে পাইলিং শেষ করা হয়।
বিষয়টি আঁচ করতে পেরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল বলছিলেন, ‘নির্মাণ শুরুর আগে লালদিয়া টার্মিনালস কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে জানতে চেয়েছে কত উচ্চতা পর্যন্ত ছাড়পত্রের অনুমতি মিলবে। এখনো প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ শুরু করেনি। নির্মাণ শুরুর আগে লিখিত অনুমতি চাইলে আমরা স্টাডি করে দেখব।’
ঝুঁকির বিষয়টি সমাধান হয়েছে দাবি করে এপিএম টার্মিনালসের দেশীয় প্রতিনিধি কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূরুল কাইয়ুম খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যে
ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, সেটি চুক্তির আগেই গত বছর সমাধান হয়েছে। এলসিটির যে ফেজে ঝুঁকির সম্ভাবনা ছিল, সেটি সরিয়ে নিয়েছি আমরা। সে ফেজে আমরা উঁচু স্থাপনা বসাব না।’
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিয়ম হচ্ছে, রানওয়ের দুই প্রান্তের ৫-১০ কিলোমিটার এলাকা সবচেয়ে সংবেদনশীল। এখানে ভবনের উচ্চতা খুবই সীমিত রাখা হয়। আর রানওয়ের কেন্দ্র থেকে ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ৪৫ মিটারের (প্রায় ১৪-১৫ তলা) বেশি উঁচু ভবন নির্মাণে কড়াকড়ি থাকে। এলসিটি সেই ব্যাসার্ধের মধ্যে পড়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনার জন্য যে বিশালাকার ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’ প্রয়োজন, সেগুলোর উচ্চতা বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত উচ্চতার বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালের ক্রেনগুলো বুম বা বাহু তোলা অবস্থায় ৮০ থেকে ৯০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। বুম না তুললে ক্রেনের উচ্চতা থাকে ৪৫ মিটার পর্যন্ত।
অন্যদিকে, লালদিয়া টার্মিনালে যে ‘পোস্ট প্যানাম্যাক্স’ ক্রেন বসানোর কথা রয়েছে, সেগুলোর উচ্চতা ৬০ মিটারের বেশি হতে পারে। এ উচ্চতা বিমানবন্দরের ‘অ্যাপ্রোচ সারফেস’ বা উড্ডয়ন-অবতরণ পথের নির্ধারিত উচ্চতা সীমাকে অতিক্রম করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রাম রানওয়ে দিয়ে নিয়মিত উড়োজাহাজ চালান এমন এক সিনিয়র পাইলট আগামীর সময়কে বলছেন, ‘ভবিষ্যতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণে দ্রুত উড়োজাহাজ ওঠানামার জন্য প্যারালাল রানওয়ে করতে হবে। পূর্বদিকে সেটির সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। পশ্চিমে আছে জনবসতি। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের চুক্তির আগেই ঝুঁকি নিরূপণ করা দরকার ছিল। চুক্তির পর সেটি করে খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে হয় না।’
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি রানওয়ের শেষে একটি নির্দিষ্ট জায়গা খালি রাখা হয়, যাতে কোনো উড়োজাহাজ যান্ত্রিক ত্রুটি বা অতিরিক্ত গতির কারণে রানওয়ে ছাড়িয়ে গেলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। একে বলা হয় রানওয়ে সেফটি এরিয়া। শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে এখন যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে লালদিয়া টার্মিনাল খুব কাছে।
শাহ আমানত বিমানবন্দর সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি যাত্রী ওঠানামা করছে এখন। বিমানবন্দরটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ যাত্রী। কিন্তু এটি ১৮ থেকে ২০ লাখ যাত্রী সামাল দিচ্ছে।
যেভাবে যাত্রী ওঠানামা প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ছাড়া উপায় নেই। এ সম্প্রসারণে বিদ্যমান রানওয়ে ট্যাক্সিওয়ে বাড়ানোর প্রয়োজন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জার্মানির একটি কোম্পানির মাধ্যমে সেটি স্টাডিও করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) থাকা কি গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলোর সর্বোচ্চ উচ্চতা (বুম বা বাহু ওপরে থাকা অবস্থায়) প্রায় ৮০ থেকে ৯০ মিটার (২৫ থেকে ৩০ তলা ভবনের সমান উঁচু)।
বুম না তুললে সেগুলোর উচ্চতা ৪৫ মিটার পর্যন্ত। অর্থাৎ, নতুন লালদিয়া টার্মিনালে ৪৫ মিটার উঁচু কি গ্যান্ট্রি ক্রেন বসালেই সেটি উড়োজাহাজ নামতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বুম ওপরে তুললে তো আর কথাই নেই।







