টেম্পোর হেলপার থেকে ফারুক এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র

মোহাম্মদ ফারুক
একসময় লোকাল টেম্পোর হেলপার ছিলেন মোহাম্মদ ফারুক। যাত্রী ওঠানো-নামানো, ভাড়া তোলা আর চালককে সহযোগিতা করাই ছিল তার প্রতিদিনের কাজ। অভাবের সংসারে কখনো না খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। অন্যের দেওয়া পোশাক পরে চলতে হয়েছে। তবু থামেনি পড়াশোনার স্বপ্ন।
সেই ফারুক এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। টিউশনির আয় দিয়ে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের খরচও সামলাচ্ছেন তিনি। দারিদ্র্য তার পথ কঠিন করেছে, কিন্তু স্বপ্ন থামাতে পারেনি।
ফারুক চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। ছোটবেলায় সংসারে তেমন অভাব ছিল না। তবে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর বদলে যায় পরিবারের পরিস্থিতি। বাবার দায়িত্বহীনতায় সংসারে বাড়তে থাকে অভাব-অনটন।
‘আল্লাহ একদিন আমাদের দিন বদলে দেবেন’
একপর্যায়ে পেটের দায়ে পরিবার চলে আসে চট্টগ্রাম শহরে। তখন সংসারের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মা আলেয়া বেগম। কখনো হোটেলে, কখনো মেসে রান্নার কাজ করতেন তিনি। দিনের শেষে সামান্য কিছু টাকা আর হোটেলে বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে ফিরতেন বাসায়। সেই খাবারই সন্তানদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন।
মা নিজের কষ্ট সন্তানদের বুঝতে দিতেন না। শুধু বলতেন, ‘আল্লাহ একদিন আমাদের দিন বদলে দেবেন।’
সংসারের অভাব ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলেন ফারুকরা। পড়াশোনার পাশাপাশি ভাই-বোন মিলে বাসায় নাস্তার ঠোঙা বানাতেন। পরে সেগুলো দোকানে দোকানে বিক্রি করতেন।
কখনো খাবারের অভাবে দিন পার করতে হয়েছে তাদের। ফারুকের নানি হোটেল থেকে সকালের বেঁচে যাওয়া নাস্তা বাকিতে এনে নাতি-নাতনিদের খাওয়াতেন। এমনও দিন গেছে, পুরো দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। এক দিন পাশের বাসার এক নারী এক কেজি চাল ও কিছু আলু এনে দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এখনো ফারুককে আবেগাপ্লুত করে।
এত ছোট বয়সে হেলপারি করছ?
অভাবের কারণে বড় ভাইয়ের টেম্পোতে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন ফারুক। যাত্রী ওঠানো-নামানো, ভাড়া তোলা আর চালককে সহযোগিতা করতেন তিনি।
এক দিন টেম্পোর এক যাত্রী ফারুককে বলেন, ‘তুমি এত ছোট বয়সে হেলপারি করছ? পড়াশোনা করো। আর যেন তোমাকে এখানে না দেখি।’
যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন
কথাগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয় তাকে। টেম্পোতে ঝুলে থাকা অবস্থায় প্রায়ই দেখতেন, তার বয়সী ছেলেমেয়েরা স্কুল কিংবা কোচিংয়ে যাচ্ছে। পরিচ্ছন্ন পোশাক, কাঁধে ব্যাগ আর নিশ্চিন্ত মুখের সেই শিক্ষার্থীদের দেখে নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি। বন্ধুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও তাকে অনুপ্রাণিত করে। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ফারুক।
মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও অর্থের অভাবে উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে হয় তাকে। বন্ধুরা যখন খেলাধুলা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ব্যস্ত, তখন ফারুকের চিন্তা ছিল অন্যরকম। মাস শেষে টিউশনি করে পাওয়া টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য চাল কেনা যাবে কিনা, সেটিই ছিল তার বড় ভাবনা।
এইচএসসি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন ফারুক। নিজের জমানো চার হাজার টাকা এবং বড় বোনের দেওয়া চার হাজার টাকা মিলিয়ে আট হাজার টাকা নিয়ে ভর্তি হন একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি কোচিংয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সামর্থ্য ছিল না। হাতে ছিল মাত্র একটি আবেদন ফরম তোলার টাকা। সেই টাকা দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে আবেদন করেন।
ফারুক বলেন, ‘এটা আমার জন্য ডু অর ডাই পরিস্থিতি ছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলে প্রাইভেটে পড়ার সামর্থ্য ছিল না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়লে সেশনজটের কারণে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যেত। তখন সংসার সামলানো আরও কঠিন হয়ে যেত। তাই নিজের কাছে একটা কথাই বলেছিলাম—চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই আমাকে পড়তে হবে।’
‘কেউ বিশ্বাসই করেনি আমি চান্স পেয়েছি’
অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান ফারুক। খবরটি প্রথম মাকে জানান তিনি।
স্মৃতিচারণা করে ফারুক বলেন, ‘ঘরে ঢুকেই মাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। জীবনে এই প্রথম মাকে জড়িয়ে ধরা।’
কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘বোনদের যখন বললাম আমি চান্স পেয়েছি, কেউ বিশ্বাসই করেনি। তারা বলছিল, আবার রেজাল্ট দেখে আয়।’
ফারুকই তাদের বংশের প্রথম ব্যক্তি, যিনি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফারুক। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেন। সেই আয় দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও পালন করছেন।
ফারুকের জীবন বদলেছে। বদলায়নি সংগ্রাম। এখনো দুবেলা ডাল-ভাত জুটলেই খুশি তিনি। তবে একসময় যে তরুণকে ময়লা টি-শার্ট পরে টেম্পোর পেছনে দৌড়াতে হতো, আজ তিনিই পরিচ্ছন্ন পোশাকে শিক্ষার্থীদের পড়ান।
তার সহপাঠীরা বলছেন, ফারুকের গল্প কোনো রূপকথা নয়। এখানে অলৌকিক কোনো ঘটনা নেই। আছে একজন মায়ের নিরবচ্ছিন্ন ত্যাগ। আছে ক্ষুধার্ত দিনের সঙ্গে লড়াই করা এক সন্তানের অদম্য ইচ্ছাশক্তি।




