দোয়েলের নিচের দুই বাসিন্দা

দোয়েল চত্বরের দোয়েলের নিচে শুয়ে আছেন ফোয়ারা দেখভালের দায়িত্বে থাকা একজন মানুষ। ছবি: সামিয়া পারভীন
দোয়েল চত্বর ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত জায়গাগুলোর একটি। তবে এখানকার ফোয়ারার পানির দিকে তাকিয়ে, কয়জনই বা ভেবেছিল দোয়েলগুলোর নিচে, পানির ধারে বাস করেন দুজন মানুষ। খবরটা জানার পর কৌতূহল থেকেই সোমবার সকালে খোঁজ নিতে গেলাম তাদের। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এখানে স্থায়ীভাবে থাকেন এই দুজন মানুষ। একজনের নাম তোতা মিয়া। আরেকজন মো. শাহীন আলম। মানুষ থাকেন এখানে? স্থায়ীভাবে? হ্যাঁ, ব্যাপারটা তা-ই। তোতা মিয়ার বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় আর শাহীন আলমের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা থানায়। দুজনের গ্রাম দুই প্রান্তে, দুজনের পথও আলাদা। অথচ এই শহরের একটা মোড়ে এসে তাঁদের জীবন একই জায়গায় থিতু হয়েছে।
তোতা মিয়া এখানে আছেন ১৬ বছর ধরে। চাকরিসূত্রেই। তিনি আর শাহীন আলম ফোয়ারা ও চত্বর দেখভালের কাজ করেন। আমরা যারা পথচারী, ফোয়ারাকে দেখি একটা সাজানো দৃশ্য হিসেবে। কিন্তু সেই দৃশ্যের পেছনে যে একটা নিয়মিত রুটিন আছে, আর সেই রুটিনের দায়িত্ব যে এই দুজনের ওপর, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম।
প্রতিদিন সকাল আটটায় তারা ফোয়ারা ছাড়েন, সকাল দশটায় বন্ধ করেন। আবার দুপুর দুইটায় ছাড়েন, বন্ধ করেন বিকেল চারটায়। মোটর চালু করা, বন্ধ করার দায়িত্বও তাদের। সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করতে হয়। মানে, দিনের চার ঘণ্টা ফোয়ারা চলে, কিন্তু তাদের কাজ চলে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে।
‘ফোয়ারা বন্ধ থাকলেও আমাদের কাজ থাকে। রক্ষণাবেক্ষণে দিনে অন্তত আট-দশ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয়। কোনো সমস্যা হলে আমরা কোম্পানিকে জানাই,’ বলেন তোতা মিয়া। যন্ত্রপাতির দিকে নজর রাখা, পানি পরিষ্কার রাখা, কোথাও কিছু গড়বড় হলে সামলে নেওয়া—সবই তাদের কাজের মধ্যে পড়ে। একটা শহরের সৌন্দর্য ধরে রাখার কাজটা এভাবেই চুপচাপ, লোকচক্ষুর আড়ালে চলে।
এই দুজন মানুষের আবাসনের পৃথক ব্যবস্থা নেই, শুনে অবাক হই। সরকারি কর্মচারীর জন্য কোয়ার্টার থাকে, কারখানার শ্রমিকের জন্য মেস থাকে, কিন্তু এখানে তেমন কিছু নেই। ‘আলাদা কোনো ব্যবস্থা নাই। কোম্পানি আমাদের থাকতে দিছে, তাই এখানেই থাকি,’ বলেন তোতা মিয়া। ফোয়ারার পাশের এই জায়গাটুকুই তাদের ঘর। যে জায়গার পাশ দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ হেঁটে যান, ছবি তোলেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, সেই জায়গাতেই তাদের বসবাস।
চারপাশে তাকিয়ে দেখি, আশপাশে ফুলগাছও আছে। এগুলো তারা আনেননি। ‘এই গাছগুলা আমরা আনি নাই। ইঞ্জিনিয়াররা এনে দিছে,’ বলেন শাহীন আলম। তিনি এখানে আছেন ১৩ বছর ধরে। তেরো বছর মানে একটা শিশুর ক্লাস ওয়ান থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ার সময়। এই সময়ে চারপাশের ঢাকা বদলে গেছে অনেকটা। ‘গত তেরো বছরে ঢাকায় মানুষ বাড়ছে, গাড়িঘোড়া বাড়ছে, শব্দ বাড়ছে। আর বাড়ছে ধুলা,’ বলেন শাহীন আলম। কথা শুনতে শুনতে চারপাশের ব্যস্ত রাস্তা, ছুটে চলা গাড়ি আর ধুলায় ধূসর হয়ে আসা শহরটাকে নতুন করে দেখি। শহর বদলেছে, ভিড় বেড়েছে, কোলাহল বেড়েছে। শুধু বদলায়নি এই দুজনের ঠিকানা।
এখানে জানিয়ে রাখা ভালো দোয়েল চত্বর ভাস্কর্য ও এর ফোয়ারার মূল রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও দেখভালের মূল দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি)।
দুজন মানুষের থাকার জায়গাটুকুতে চোখ বুলিয়ে দেখি, খুব বেশি কিছু নেই। কোম্পানির দেওয়া একটা ছোট চৌকি, একটা চেয়ার, একটা বালতি, কাপড় নেড়ে দেওয়ার দড়ি আর তাতে এক-দুটো হ্যাঙ্গার। একটা মানুষের জীবন এত অল্প জিনিসে কীভাবে চলে, সেটা ভাবলে অবাক লাগে। যে চৌকিতে রাতে ঘুমান, সেটাই হয়তো দিনে বসার জায়গা। বালতিতে পানি ধরা হয়, কাপড় ধোয়া হয়। দড়িতে ভেজা কাপড় ঝুলে থাকে, রোদে শুকায়। শহরের রাস্তায় যখন গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল শুনি, তখন ওই দড়িতে দুলতে থাকা কাপড়গুলোই মনে করিয়ে দেয়, এখানে রয়েছে করো ঠিকানা।
প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য আছে শিশু একাডেমি, আর খাবার বাইরে সুবিধামতো খেয়ে নেন। নিজের একটা বাথরুম, নিজের রান্নাঘর—এসব সাধারণ সুবিধা এখানে নেই। কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারি, দৈনন্দিন প্রয়োজনের অনেকটাই নির্ভর করে আশপাশের প্রতিষ্ঠান আর দোকানের ওপর।
দিনের বেলায় দোয়েল চত্বরে মানুষের কমতি দেখি না। শিক্ষার্থী, পথচারী, ফটোগ্রাফার—সবাই আসেন, ছবি তোলেন, চলে যান। কেউ হয়তো ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হন। কিন্তু রাত নামলে চিত্রটা বদলে যায়। ভিড় কমে আসে, গাড়ির শব্দ ফিকে হয়। তখনও এই দুজন সেখানেই থাকেন। বাকি শহর যখন ঘরে ফেরে, তখন তাদের ঘরে ফেরার কিছু নেই, কারণ তারা ঘরেই আছেন।
খোলা আকাশের নিচে থাকার কষ্ট সব ঋতুতেই। ‘শীতের সময় বাতাসে কিছুটা কষ্ট হয়। এখন যেমন মশার কষ্ট। প্রচণ্ড গরমের দিনেও একটু কষ্ট হয়,’ বলেন তোতা মিয়া। তার কথা শুনে চারপাশের খোলা জায়গাটার দিকে তাকাই। দেয়াল নেই, ছাদ নেই, তাই শীত, গরম, মশা—কোনোটা থেকেই আড়াল নেই।
আর বৃষ্টি নামলে? ‘বৃষ্টির দিনে আশপাশ থেকে পানি আসে। তখন গা-মাথা ঢেকে থাকি,’ বলেন শাহীন আলম। এই কথা শুনে ফোয়ারার পানির দিকে তাকাই। যে পানির খেলা দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়, বৃষ্টির দিনে আকাশের পানি আর চারপাশের পানি এসে সেই জায়গাটাই তাদের জন্য কঠিন করে তোলে।
‘ভালোই আছি,’ বলেন তোতা মিয়া। শাহীন আলমও একই কথা বলেন। শুনে আমি ভাবি, এটা কি সত্যিই ভালো থাকা? আমাদের অনেকের কাছে যে জীবন কষ্টের বলে মনে হতে পারে, তারা সেই জীবন নিয়েই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন। তবে ভালো থাকার মাপকাঠি সবার কাছে এক নয়। নিজেদের জীবনকে তারা খুব অল্পে গুছিয়ে নিয়েছেন। যে মানুষ বছরের পর বছর অল্পে চলতে শিখেছেন, তার কাছে অল্পই হয়ে ওঠে যথেষ্ট। হয়তো অভিযোগ করে লাভ নেই বলেই অভিযোগ কমে গেছে। হয়তো চাকরিটা টিকে থাকাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
দুজনেরই পরিবার আছে দেশের বাড়িতে। তাঁরা থাকছেন এখানে। বছরের পর বছর স্ত্রী-সন্তানদের থেকে দূরে থাকা, ছুটিছাটায় বাড়ি ফেরা, আবার ফিরে আসা—এই চক্রের মধ্যেই জীবন। ‘পরিবারের সঙ্গে কয়েক মাসে একবার দেখা হয়। ছুটি থাকলে, আর ঈদের সময় বাড়ি যাই,’ বলেন তোতা মিয়া। কথাটা শুনে মনে হয়, বছরের বাকি দিনগুলো কাটে ফোনের এপার-ওপারের দূরত্বে। যাদের জন্য কাজ করেন, মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকেন, তাদের সঙ্গেই প্রতিদিনের জীবন ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবু এই দূরত্বের একটা হিসাব আছে। ‘ছেলেরা নিজেদের মতো কাজ করে, মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের কেউ কেউ পড়াশোনা করছে,’ বলেন শাহীন আলম। আর এই সংসার চালাতে তারা কী করেন? ‘প্রতিমাসেই বাড়িতে টাকা পাঠাই,’ বলেন তোতা মিয়া। কথাটা শুনে তাদের ছোট্ট থাকার জায়গাটার দিকে আবার তাকাই। ঢাকার এই মোড়ে একটা চৌকি আর একটা বালতি নিয়ে যিনি পড়ে আছেন, তাঁর উপার্জনেই হয়তো দেশের বাড়িতে কারও বই-খাতা কেনা হচ্ছে, কারও সংসার চলছে।
এখন আমার কাছে দোয়েল চত্বরকে আর আগের মতো শুধু একটা মোড় বলে মনে হয় না। মনে হয় এটা দুজন মানুষের ঠিকানাও। দোয়েলের ডানার নিচে, ফোয়ারার পানির ধারে, একটা ছোট চৌকি আর একটা বালতি নিয়ে তারা আছেন। আমরা অবশ্য তাদের দেখি না, ফোয়ারা দেখি। অথচ ফোয়ারা চালু রাখা ও সচল রাখার পেছনে আছে এই দুজন মানুষের শ্রম, যা আমরা জানিও না কিংবা জানতাম না।
পরের বার দোয়েল চত্বর দিয়ে যাওয়ার সময় একটু থামবেন। ফোয়ারার পানির দিকে তাকাবেন, তারপর দোয়েলের নিচে চোখ নামাবেন। হয়তো দেখতে পাবেন দড়িতে ঝুলছে একটা গামছা, কিংবা চেয়ারে বসে আছেন একজন মানুষ। আমিও যদি আবার সেখানে যাই, ফোয়ারার দৃশ্যের পাশাপাশি এই মানুষ দুজনের কথাও মনে পড়বে।






