গোলাপি হ্রদের রহস্য

পিঙ্ক লেক, হাট লেগুন, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া
রূপকথার বইয়ের পাতা উল্টালে আমরা কতই না জাদুকরী জায়গার খোঁজ পাই! কিন্তু যদি বলা হয়, বাস্তবেও এমন একটি জায়গা আছে, যার জলের রঙ অবিকল স্ট্রবেরি মিল্কশেক বা বাবলগামের মতো গাঢ় গোলাপি? হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়ার হিলিয়ার হ্রদ ঠিক এমনই এক বিস্ময়। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাঢ় নীল ভারত মহাসাগরের ঠিক পাশেই কেউ গোলাপি রঙের এক জাদুকরী ক্যানভাস তৈরি করে রেখেছে। পৃথিবীর অন্যতম 'ভিন্ন গ্রহের মতো' বা 'Otherworldly' গন্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই স্থানটি পর্যটকদের কাছে এক স্বপ্নের মতো।
গোলাপি রহস্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
এই মোহনীয় গোলাপি রঙের পেছনে কোনো জাদু নেই; বরং রয়েছে প্রকৃতির এক অসামান্য বিজ্ঞান। মূলত ডুনালিয়েলা সালিনা নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র শৈবাল এবং কিছু লবণপ্রেমী ব্যাকটেরিয়া (যেমন- স্যালিনিব্যাকটার রুবার) এই রঙের প্রধান কারিগর। অস্ট্রেলিয়ার প্রখর রোদ ও অতিবেগুনি রশ্মি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবগুলো 'বিটা-ক্যারোটিন' নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে। অত্যাধিক লবণাক্ত পরিবেশে যখন এরা বেঁচে থাকার লড়াই করে, তখনই হ্রদের জল এমন উজ্জ্বল গোলাপি আকার ধারণ করে।
হারাচ্ছে রূপ, বিপন্ন প্রকৃতি
হাজার বছর ধরে টিকে থাকা রূপকথার এই হ্রদগুলো এখন মানুষের কর্মকাণ্ড ও প্রকৃতির রোষানলে চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণের কারণে এই হ্রদগুলো তাদের চিরচেনা রঙ হারাতে বসেছে।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এসপেরান্সের কাছের বিখ্যাত 'পিংক লেক' বা গোলাপি হ্রদটি অতিরিক্ত লবণ উত্তোলনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। একসময় এখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রচুর লবণ উত্তোলন করা হতো। এর ফলে হ্রদের লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকেই এটি তার গোলাপি রঙ হারিয়ে নীলচে-ধূসর হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট অতিবৃষ্টির ফলেও হ্রদে মিষ্টি জলের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে লবণাক্ততা কমে গিয়ে সাধারণ সবুজ শৈবালগুলো আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ পায়। সম্প্রতি নজিরবিহীন ভারী বৃষ্টির কারণে স্বয়ং হিলিয়ার হ্রদটিও তার বিখ্যাত গোলাপি আভা হারিয়েছে। বর্তমানে শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, সেনেগাল থেকে বলিভিয়া পর্যন্ত বিশ্বের ছয়টি মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা গোলাপি হ্রদগুলো পরিবেশ বিপর্যয়ের এক দৃশ্যমান ব্যারোমিটার বা নির্দেশক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আশা ও পুনরুদ্ধারের গল্প
প্রকৃতি যেমন ভাঙতে জানে, তেমনি নিজেকে সারিয়ে তুলতেও জানে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, হিলিয়ার হ্রদ আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তার হারানো রঙ ফিরে পাবে। অন্যদিকে, যে 'পিংক লেক' মানুষের কারণে রঙ হারিয়েছিল, তাকে বাঁচাতে এখন মানুষই এগিয়ে এসেছে। বিজ্ঞানীরা পাশের 'লেক ওয়ার্ডেন' (যেখানে কৃষিকাজের বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে প্রচুর লবণ জমেছে) থেকে অতিরিক্ত লবণ এনে এই হ্রদে পাম্প করার একটি চমৎকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যেই হয়তো হ্রদটি তার পুরনো রূপ ফিরে পাবে।
অস্ট্রেলিয়ার এই গোলাপি হ্রদগুলোর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা। মানুষের অবিবেচক কাজে প্রকৃতি কত দ্রুত তার ভারসাম্য হারায়, এটি তারই প্রমাণ। তবে ধ্বংসের পর এই মেরামতের নতুন প্রচেষ্টা আমাদের আশা জোগায় যে, আমরা চাইলে এখনো প্রকৃতির এই জাদুকরী সৌন্দর্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে পারি।
সূত্রঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, টাইম আউট অস্ট্রেলিয়া, অ্যাটলাস অবস্কিউরা







