প্রকৃতি প্রত্যয়
নীলমণিলতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মার ঢাকার একটি দৈনিকের প্রকৃতিবিষয়ক লেখায় পাওয়া যায়, ‘সিদ্ধেশ্বরীতে একাধিক বাড়িতে এখন নীলমণিলতা ফুল ফুটেছে। সবচেয়ে কাছের বাড়িটিতে হানা দিলাম। বন্ধুগৃহ। সঙ্গে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। সাদর অভ্যর্থনা মিলল। নিচ থেকে, পাশ থেকে, ছাদ থেকে মামুন অনেক ছবি তুললেন। বুঝলাম, তিনিও এই নীলিমাবন্যায় দিশাহারা। এই বিদেশিনীকে শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণের কোণে একদা ঠাঁই দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু পিয়র্সন। বাকিটা স্বয়ং বনবাণীর কবির জবানিতেই শুনুন : অনেককাল অপেক্ষার পরে নীল ফুলের স্তবকে স্তবকে একদিন সে আপনার অজস্র পরিচয় অবারিত করলে।
নীল রঙে আমার গভীর আনন্দ, তাই এই ফুলের বাণী আমার যাতায়াতের পথে প্রতিদিন আমাকে ডাক দিয়ে বারবার স্তব্ধ করেছে। আমার দিক থেকে কবিরও বলার ইচ্ছা হতো। কিন্তু নাম না পেলে সম্ভাষণ করা চলে না। তাই নাম দিয়েছি নীলমণিলতা। উপযুক্ত অনুষ্ঠানের দ্বারা সেই নামকরণটি পাকা করার জন্য। নীলমণিফুল যেখানে চোখের সামনে ফোটে, সেখানে নামের দরকার হয়নি। কিন্তু একদা অবসানপ্রায় বনান্তের দিনে দূরে ছিলুম, সেদিন রূপের স্মৃতি নামের দাবি করলে। ভক্ত ১০১ নামে দেবতাকে ডাকে সে শুধু বিরহের আকাশকে পরিপূর্ণ করার জন্য।
ফাল্গুনমাধুরী তার চরণের মঞ্জীরে মঞ্জীরে
নীলমণি মঞ্জরীর গুঞ্জন বাজায়ে দিল কিরে।
আকাশ যে মৌনভার,
বহিতে পারে না আর,
নীলিমাবন্যায় শূন্যে উচ্ছলে অনন্ত ব্যাকুলতা,
তারি ধারা পুষ্পপাত্রে ভারি নিল নীলমণিলতা।
ভরতপুর
১৭ চৈত্র ১৩৩৩’
নীলমণিলতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় বাংলা একাডেমিতে। একদিন বটতলার ছায়ায় কিছুক্ষণ জিরিয়ে ভাবছিলাম বর্ধমান হাউজের ভেতর দিয়ে ওপারে চলে যাব। হঠাৎ বেদনার রঙ নীলের একটা ছটা আমাকে টেনে নিয়ে গেল রবীন্দ্র চত্বরে।
ভবনের দেয়াল ঘেঁষেই ডানদিকে তাকাতেই দেখি তিনতলা অবধি চলে গেছে বেয়ে বেয়ে। বিমুগ্ধ নয়নে চেয়েছিলাম অনেকটাক্ষণ। লতাটি রোপণ করেছিলেন বাংলা একাডেমির সহকর্মী নিসর্গী এবং প্রকৃতিবিষয়ক জনপ্রিয় লেখক মোকারম হোসেন। আবার মুগ্ধতায় আবেশিত হলাম রংপুরে নান্দনিক নিসর্গে আচ্ছাদিত সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের উল্টোদিকের সিক্স সিজনস কমিউনিটি সেন্টারের অফিস গেটে।
পাতা উপবৃত্তাকার, খসখসে, হালকা সবুজ, কখনো কখনো শিরা বরাবর ঢেউ খেলানো। পাতা লম্বা এবং চওড়া হয়। মঞ্জরিদণ্ড তিন থেকে চার ইঞ্চি লম্বা এবং গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত অনেক ফুল হয়। প্রত্যেক পাতার কক্ষ থেকে মঞ্জরিদণ্ড বের হয় এবং পুরো লতাটি ফুলে ফুলে ভরে যায়। ফুলে পাঁচটি পাপড়ি থাকে। টেপাল (ফুলের এমন একটি অংশ যেখানে বৃতি এবং দলমণ্ডরের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যায় না বা এগুলো দেখতে একই রকম।) পাঁচটি। পাপড়ির চেয়ে টেপালের আকার বড়। টেপাল নীল রঙের। নীলমণিলতা নামটি রবিঠাকুরের দেওয়া। শান্তিনিকেতনে এই ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই নাম দিয়েছিলেন।
মধ্য আমেরিকায় আদিবাস নীলমণি লতানো বা ঝোপালো হয়। রোদ খুবই পছন্দ। বীজ থেকে গাছ হয়, তবে গুটি কিংবা শাখাকলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা উত্তম। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Petrea volubilis ইংরেজি নাম Queen’s Wreath, Bluebird Vine, Sandpaper Vine পরিবার Verbenaceae.
রবীন্দ্রনাথ পেট্রিয়া নামের এই বিদেশি লতার নাম রেখেছেন নীলমণি। নামটি একেবারে যথার্থ এ কারণেই যেন বসন্তের নীল প্রজাপতি। পাতাগুলো খুব বড় এবং খসখসে। বসন্তকালে অল্প সময়ের জন্য ফুল ফোটে। আর তারপর ছুটে আসে মৌমাছিরা দলে দলে। ফুলের পাপড়িগুলো দুই স্তরে সুসজ্জিত। বাসি ফুল রঙ বদলে প্রথমে বেগুনি পরে প্রায় সাদা রঙ ধারণ করে। নীলমণি কাষ্ঠললতার বড় ঝাড়। অনেক ওপরে উঠতে পারে। শিকড় থেকে কখনো কখনো চারা গজায়। ডালের পর্বসন্ধিতেও মাঝেমধ্যে শিকড় আসে। বীজ এবং কলম দ্বারা বংশবিস্তার হয়ে থাকে।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক



