প্রকৃতি প্রত্যয়
একই ফুলে দুই রূপ সুষমা

অফিসে যাওয়া-আসার পথে তিনবার অটো বদলাতে হয়। প্রতিদিনের মতো সেদিনও অফিসের পথে বেরিয়েছি। দিনটি ছিল এইচএসসি পরীক্ষার। অটোতে যাত্রীর ভিড়, তার ওপর সবার মধ্যে তাড়াহুড়ো। এমন সময় একজন প্রায় হুড়মুড় করে এসে আমার পাশের আসনে বসলেন। প্রথমে খেয়াল করিনি। পরক্ষণেই কানে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর— ‘আরে দোস্ত, তুই!’ মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই চেনা মুখ। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের সহপাঠী, প্রিয় বন্ধু এ টি এম শহীদুল ইসলাম সুজন। বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের উপ-রেজিস্ট্রার।
কতদিন পর এমন আকস্মিক দেখা! পুরনো দিনের স্মৃতি আর বন্ধুত্বের উষ্ণতা মুহূর্তেই ফিরে এলো। কথার ফাঁকে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তা সকালে কোথা থেকে ছুটে আসছিস? ঘেমেনেয়ে একাকার!’
সুজন যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বলল, ‘আর বলিস না। মেয়েকে রংপুর সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্রে দিয়ে এলাম। মাইলস্টোন কলেজে বিমান দুর্ঘটনার কারণে পিছিয়ে যাওয়া রসায়ন পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই আজ থিওরি পরীক্ষা শেষ। এরপর প্র্যাকটিক্যাল। তারপর মেয়ের একটাই ইচ্ছা— মেডিকেল কোচিং করে সরকারি কোনো মেডিকেল কলেজে পড়বে।’
বন্ধুর কথায় মেয়েকে ঘিরে তার স্বপ্ন আর প্রত্যাশার ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠল। সন্তানের স্বপ্নের সঙ্গে বাবা-মায়ের স্বপ্নও যে নীরবে বেড়ে ওঠে! মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুজনের কথায় ছিল সেই পরিচিত পিতৃসুলভ মমতা, উদ্বেগ আর আশাবাদ।
কথা বলতে বলতে একসময় জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা, আমাদের মামণিটার নাম কী?’
বন্ধুর কণ্ঠে তখন গর্বের দীপ্তি— ‘সেমন্তী ইসলাম সুষমা।’
সুষমা! নামটি কানে বাজতেই যেন মনের ভেতর কোথাও একটি ফুলের ছবি ফুটে উঠল। বন্ধুকে বললাম, ‘আচ্ছা, তুই কি জানিস, সুষমা নামে চমৎকার একটি ফুলও আছে?’
কথাটা বলেই মনে পড়ে গেল সেই ফুলের কথা। প্রকৃতির কত নাম, কত রূপ! মানুষের নামের মধ্যেও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর কোনো পরিচয়। সুষমা নামটির মধ্যেও তেমনই এক ফুলের সৌন্দর্য জড়িয়ে আছে।
প্রথমে ফুল ফোটে বেগুনি রঙে। কয়েক দিন পর সেই বেগুনি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে, একসময় ধারণ করে শুভ্র সাদা রূপ। যেন একই ফুলের জীবনে রঙের এক মায়াবী যাত্রা— গতকাল বেগুনি, আজ তার রঙ বদলাচ্ছে, কাল সে হয়ে উঠবে সাদা। ইংরেজি নাম Yesterday, Today and Tomorrow যেন এই রূপান্তরের গল্পই বলে।
গাছটির ফল বেরিজাতীয়। সাধারণত ডাল কাটিং বা কলমের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার করা হয়। বীজ ও গুটিকলমের মাধ্যমেও চারা তৈরি সম্ভব। তাই শখের বাগানে সুষমা লাগাতে চাইলে বাড়ির আঙিনা কিংবা টবেও একে জায়গা দেওয়া যায়।
বন্ধু সুজনের মেয়ে সেমন্তী ইসলাম সুষমা এখন পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ থেকে মাইগ্রেট (স্থানান্তর) হয়ে নীলফামারী মেডিকেল কলেজে আমার কাজিনের মেয়ে রোজা আসকারীর সঙ্গে পড়ছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক



