একই রাতে কালীপূজা এবং দীপাবলি কেন?

দেবী কালীর আরাধনা আর দীপাবলির আলোর উৎসব একই রাতে কেন? ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাত। বাঙালি হিন্দুদের ঘরে ঘরে উৎসবের আবহ। কোথাও মন্দিরে, কোথাও বাড়ির পূজামণ্ডপে চলছে দেবী কালীর আরাধনা। আবার বাড়ির আঙিনা, বারান্দা, দরজা কিংবা মন্দিরের সামনে জ্বলছে সারি সারি প্রদীপ। আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে চারপাশ। বাঙালি হিন্দু সমাজে এই রাত পরিচিত শ্যামাপূজা বা কালীপূজার রাত হিসেবে। একই সঙ্গে পালিত হয় দীপাবলি।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, দেবী কালীর আরাধনা আর দীপাবলির আলোর উৎসব একই রাতে কেন? কালীপূজার সঙ্গে প্রদীপ জ্বালানোর সম্পর্ক কী? এর পেছনে কি রয়েছে কোনো ধর্মীয় আখ্যান, নাকি একই তিথিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে হিন্দু পঞ্জিকার একটি বিশেষ তিথিতে। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে বাংলাদেশে পালিত হয় শ্যামাপূজা বা কালীপূজা। একই রাত পরিচিত দীপাবলি বা আলোর উৎসব হিসেবেও। অর্থাৎ, এখানে কালীপূজা ও দীপাবলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন দুটি আয়োজন নয়। বরং দেবী কালীর আরাধনা, প্রদীপ জ্বালানো এবং পূর্বপুরুষদের স্মরণ- সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই রাতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহ।
একই অমাবস্যা, আরাধনা ও আলোর উৎসব
দীপাবলি শব্দের অর্থ প্রদীপের সারি। অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালানো এই উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু সমাজে কার্তিক অমাবস্যার রাতটি বিশেষভাবে পরিচিত শ্যামাপূজা বা কালীপূজার জন্য। সন্ধ্যার পর বাড়িঘর, মন্দির ও পূজামণ্ডপে প্রদীপ জ্বালানো হয়। কোথাও মোমবাতি, কোথাও বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জায় সাজানো হয় চারপাশ।
দেবী কালীর আরেক নাম শ্যামা। তাই তার পূজাকে শ্যামাপূজা বলা হয়। শাক্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবী কালী আদ্যাশক্তির রূপ। তিনি শক্তি, সংহার ও অশুভ বিনাশের প্রতীক। ভক্তরা তার কাছে ভয়, বিপদ ও অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির প্রার্থনা করেন।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলির রাতে দেবী লক্ষ্মীর পূজা বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে বাঙালি হিন্দুদের কাছে কার্তিক অমাবস্যার প্রধান আয়োজন শ্যামাপূজা।
অন্ধকার রাতে কালীর আরাধনা কেন?
কালীপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর নিশীথকালীন আয়োজন। সাধারণত অমাবস্যার রাতে মধ্যরাতের কাছাকাছি সময়ে মন্দির ও পূজামণ্ডপে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি, হোমযজ্ঞ ও আরতির মধ্য দিয়ে চলে আরাধনা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নিশীথকালে দেবী কালীর পূজা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
দেবীর পৌরাণিক পরিচয়ের সঙ্গেও অশুভ বিনাশের ধারণা জড়িয়ে আছে। রক্তবীজ নামের এক অসুরের সঙ্গে তার যুদ্ধের কাহিনি এর উদাহরণ। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, রক্তবীজের রক্তের প্রতিটি ফোঁটা মাটিতে পড়লেই নতুন অসুরের জন্ম হতো। দেবী কালী তার রক্ত পান করে মাটিতে পড়তে না দেওয়ায় অসুরের বংশবিস্তার বন্ধ হয়। এভাবে অশুভ শক্তির বিনাশের মধ্য দিয়ে দেবীর বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
কালীপূজার আগের দিন পালিত হয় ভূত চতুর্দশী। এদিন ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই প্রদীপ পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে সুরক্ষার প্রতীক। অনেক পরিবারে ১৪ রকম শাক খাওয়ার রীতিও রয়েছে, যা চোদ্দো শাক নামে পরিচিত। তবে অঞ্চল ও পরিবারভেদে এসব রীতির চর্চায় পার্থক্য দেখা যায়।
পূর্বপুরুষদের স্মরণেও জ্বলে প্রদীপ
বাংলাদেশের দীপাবলি উদ্যাপনের একটি বিশেষ দিক হলো পূর্বপুরুষদের স্মরণ। এ রাতে অনেকেই বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি শ্মশানে গিয়ে প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতির উদ্দেশে আলো জ্বালান। তাদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনাও করেন।
বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশানে দীপাবলি উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেখানে প্রয়াত স্বজনদের সমাধি ও স্মৃতিস্থানে মোমবাতি জ্বালানো হয়। পুরো মহাশ্মশান আলোকসজ্জায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সরকারের ঐতিহ্যবিষয়ক তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত বিবরণ অনুযায়ী, বরিশালের এই শ্মশানকেন্দ্রিক দীপাবলি উৎসবের প্রচলন ১৯২৮ সাল থেকে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ সেখানে সমবেত হন।
ঢাকাতেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনসহ বিভিন্ন মন্দিরে শ্যামাপূজার আয়োজন করা হয়। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও বাংলাবাজারেও থাকে উৎসবের আমেজ।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের হিন্দুদের কাছে কার্তিক অমাবস্যার রাত কেবল দেবী কালীর আরাধনার রাত নয়, একই সঙ্গে আলোর উৎসব ও পূর্বপুরুষদের স্মরণের উপলক্ষ। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে দীপাবলির সঙ্গে রামচন্দ্রের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন কিংবা লক্ষ্মীপূজার আখ্যান ও রীতি জড়িয়ে থাকলেও, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এই রাতের প্রধান ধর্মীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে শ্যামাপূজাকে কেন্দ্র করে।
তাই একই রাতে মন্দিরে দেবী কালীর আরাধনা আর ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর দৃশ্য আসলে একই অমাবস্যাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় বিশ্বাস ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রকাশ। একদিকে অশুভ বিনাশের শক্তির আরাধনা, অন্যদিকে অন্ধকারের মধ্যে আলোর উদ্যাপন।
সূত্র: ফুল, ওয়াক অ্যানাদার মাইল, দ্য স্টেটসম্যান






