১৯৮০ সালে ইতালিয়ান ফুটবল কেঁপে ওঠে ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে
ছিলেন নিষিদ্ধ হয়ে গেলেন মহাতারকা

পাওলো রসি
ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু গল্প আছে, যেগুলো শুনলে মনে হয় হলিউডের কোনো স্পোর্টস মুভির কাহিনি। ইতালির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার পাওলো রসির জীবন তেমনই এক গল্প।
১৯৮০ সালে ইতালিয়ান ফুটবল কেঁপে ওঠে ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে। ‘টোটোনেরো’ নামে পরিচিত সেই ঘটনায় রসির নামও জড়িয়ে যায়। তিনি বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও তাঁকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। হঠাৎ করেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার পরিণত হন বিতর্কিত এক চরিত্রে। অনেকের ধারণা ছিল, তাঁর ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ।
বিশ্বকাপ দলে জায়গা, কিন্তু চারদিকে সমালোচনা
দুই বছর মাঠের বাইরে থাকার পর ১৯৮২ সালে তাঁর নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। কিন্তু তখনও প্রশ্ন ছিল— এতদিন খেলার বাইরে থাকা একজন ফুটবলার কি বিশ্বকাপের মতো আসরে সফল হতে পারবেন?
ইতালির কোচ এনজো বেয়ারজট অবশ্য ভিন্নভাবে ভেবেছিলেন। তিনি রসিকে দলে রাখেন। এই সিদ্ধান্তে সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের মতে, ফর্মহীন একজন খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপে নেওয়া ছিল বড় ঝুঁকি।
স্পেনে অনুষ্ঠিত ১৯৮২ ফিফা বিশ্বকাপের শুরুটাও রসির জন্য ছিল হতাশাজনক। গ্রুপ পর্বে তিনি কোনো গোল করতে পারেননি। ইতালির পারফরম্যান্সও ছিল নিষ্প্রভ। সমালোচকরা তখন বলতে শুরু করেন, কোচের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
ব্রাজিলের বিপক্ষে বদলে যায় সবকিছু
কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও এমন নাটকীয় মোড় নেয়, যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল দুর্দান্ত ব্রাজিল। সেই ব্রাজিল দলে ছিলেন জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওয়ের মতো তারকা। অনেকেই তাদের বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল মনে করতেন।
সেই ম্যাচেই বিস্ফোরণ ঘটান রসি। একের পর এক আক্রমণে তিনি করেন হ্যাটট্রিক। ইতালি জিতে যায় ৩-২ গোলে। ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনার ভাষা বদলে যায়। যে খেলোয়াড়কে কয়েকদিন আগেও ব্যর্থ বলা হচ্ছিল, তিনিই হয়ে ওঠেন ইতালির সবচেয়ে বড় আশা।
সেমিফাইনাল থেকে ফাইনাল— নায়কের উত্থান
রসির জাদু থামেনি সেখানেই। সেমিফাইনালে পোল্যান্ড-এর বিপক্ষে তিনি করেন দুটি গোল। ইতালি উঠে যায় ফাইনালে।
ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও রসি নিজেকে প্রমাণ করেন। ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে তাঁর পা থেকেই। শেষ পর্যন্ত ইতালি ৩-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য প্রত্যাবর্তন
মাত্র তিনটি নকআউট ম্যাচে ছয় গোল করে রসি জিতে নেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’। পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পান ‘গোল্ডেন বল’।
খেলাধুলার ইতিহাসে অনেক কামব্যাকের গল্প আছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার অন্ধকার থেকে উঠে এসে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বকাপের নায়ক হয়ে যাওয়ার ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। তাই ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ শুধু ইতালির শিরোপা জয়ের গল্প নয়; এটি পাওলো রসির পুনর্জন্মের গল্পও— একজন মানুষ, যিনি প্রায় হারিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের নাম চিরস্থায়ী করে গেছেন।
সূত্র: গার্ডিয়ান, ব্রিটানিকা, উইকি





