যে জাদুতে বদলে গেছে সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরের বিশ্বখ্যাত রিসোর্ট, হোটেল মেরিনা বে স্যান্ডস
৯ আগস্ট, ১৯৬৫। টিভির পর্দায় চোখ রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে সিঙ্গাপুরের সাধারণ মানুষ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের প্রিয় নেতা লি কুয়ান ইউ, আর তার চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে! নিজেকে সামলে নিতে প্রায় ৩০ সেকেন্ড চুপ করে রইলেন তিনি, পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলেন। কারণটা ছিল ভয়ংকর। যে মালয়েশিয়ার সাথে এক হয়ে থাকার স্বপ্ন তিনি সারা জীবন দেখেছেন, সেই মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরকে আক্ষরিক অর্থেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে।
চারপাশের অবস্থা তখন রীতিমতো দমবন্ধ করা। ছোট্ট একটা দ্বীপরাষ্ট্র, নিজেদের বলতে এক ফোঁটা প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। মানুষের দারিদ্র্য তখন আফ্রিকার অনেক গরিব দেশকেও হার মানায়। খাওয়ার পানির জন্যও ভরসা করতে হয় সেই মালয়েশিয়ার ওপর, যারা সবেমাত্র সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। চারপাশে দুই বৈরী প্রতিবেশী, আর কারখানা বা ব্যবসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু কে জানত, এই ঘোর অন্ধকার থেকেই জন্ম নেবে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপকথার গল্প! মাত্র ৬০ বছরের ব্যবধানে সেই ধুঁকতে থাকা সিঙ্গাপুরই আজ পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও উন্নত দেশগুলোর একটিতে। কীভাবে ঘটল এই অসম্ভব ম্যাজিক?
স্রোতের বিপরীতে এক পাগলাটে সিদ্ধান্ত
সেই ষাটের দশকে সদ্য স্বাধীন হওয়া গরিব দেশগুলোকে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংকের মতো বড় বড় সংস্থা একটা বাঁধাধরা বুদ্ধি দিত। তারা বলত, "বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেশে ঢুকতে দিয়ো না, বরং নিজেদের দেশের শিল্পকে বাঁচাও।"
কিন্তু সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এবং তার অর্থমন্ত্রী গোহ কেং সুই বুঝলেন, তাদের দেশের যা অবস্থা, তাতে এই পথে হাঁটলে না খেয়ে মরতে হবে। কারণ, তাদের নিজস্ব কোনো বাজার নেই, আর দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার মতো সময় বা টাকাও তাদের হাতে নেই। তাই তারা নিলেন এক চরম উল্টো আর দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত। তারা ভাবলেন, দেশীয় শিল্প বাঁচানোর চিন্তা বাদ, বরং পুরো দুনিয়ার জন্য সিঙ্গাপুরের দরজা হাট করে খুলে দিতে হবে! বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেশে ডাকার জন্য কোনো শুল্ক বা ট্যাক্স রাখলেন না তারা, দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে বেছে নিলেন আর বিদেশি বিনিয়োগ আনার এক আগ্রাসী কৌশল হাতে নিলেন।
বিশ্বজয়ের দারুণ এক 'সেলস পিচ'
বিদেশি কোম্পানিগুলোকে নিজেদের দেশে টেনে আনতে ১৯৬১ সালে গোহ কেং সুই তৈরি করেছিলেন 'ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড' বা ইডিবি। এই বোর্ডের কর্মকর্তারা তখন রীতিমতো 'সেলসম্যান' বা বিপণনকর্মীর ভূমিকায় নেমে পড়লেন। তারা আমেরিকা, ইউরোপ আর জাপানের বড় বড় কোম্পানির সদর দপ্তরে ছুটে যেতেন দারুণ সব অফার নিয়ে। তারা বলতেন, "আমাদের দেশে আসুন। টানা ১০ বছর কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না, আপনাদের জন্য আমরা বিশাল জুরং শিল্পাঞ্চলে কারখানা বানানোর সব রেডি করে রেখেছি। আমাদের কর্মীরা ইংরেজি জানে আর সরকারি খরচেই তাদের সব ট্রেনিং দেওয়া আছে।" এমনকি, কোনো সমস্যা হলে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হতো!
তাদের এই জাদুকরী প্রস্তাবে কাজ হলো জাদুর মতোই। ১৯৬৮ সালে 'টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টস' আর ১৯৭০ সালে 'এইচপি'-এর মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে চলে এলো।
দেখতে দেখতে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি সিঙ্গাপুরে তাদের কারখানা খুলে বসল। যে দেশে ১৯৬৫ সালে বেকারত্বের হার ছিল ১৪ শতাংশ, মাত্র আট বছরের মাথায় তা নেমে এলো ৪ শতাংশে। আর মানুষের মাথাপিছু আয়? ১৯৬৫ সালের ৫১৬ ডলার থেকে একলাফে বেড়ে তা পৌঁছালো ১,৫০০ ডলারে!
জাদুর পেছনে যে কঠিন বাস্তবতা
তবে এই গল্পের পেছনে একটা নির্মম সত্যও লুকিয়ে আছে। রাতারাতি এমন অভূতপূর্ব উন্নতির জন্য সিঙ্গাপুরের মানুষকে বেশ চড়া মূল্য চোকাতে হয়েছিল। আর তা হলো তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা।
অর্থনীতিকে দ্রুত চাঙ্গা করার স্বার্থে লি কুয়ান ইউয়ের সরকারকে তখন বেশ কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। বিরোধীদের দমন করতে ব্রিটিশ আমলের এক কড়া 'অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইন' ব্যবহার করা হয়, যেখানে বিনা বিচারে যে কাউকে আটকে রাখার ক্ষমতা ছিল সরকারের হাতে। ১৯৬৩ সালে 'অপারেশন কোল্ডস্টোর'-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীদের জেলে পোরা হয়, ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে আনা হয় কড়া শাসনে। এমনকি সমালোচক সাংবাদিক বা নেতাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই ১৯৫৯ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে শুধু একটি দলই ক্ষমতায় আছে—পিপলস অ্যাকশন পার্টি। সোজা কথায়, পশ্চিমা দেশগুলো যে বাক্স্বাধীনতার বড়াই করে, উন্নত জীবন পাওয়ার আশায় সিঙ্গাপুরকে সেই স্বাধীনতার অনেকটাই বিসর্জন দিতে হয়েছিল।
ষাট বছর পরের অন্য এক পৃথিবী
১৯৬৫ সালে টিভিতে লি কুয়ান ইউয়ের সেই কান্না দেখেছিলেন মাত্র ১৯ লাখ সিঙ্গাপুরবাসী। আর আজ, ছয় দশক পর, সেই মানুষগুলোর পরিশ্রম আর ত্যাগের ফসল দেখে পুরো পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
যাদের একসময় খাওয়ার টাকা ছিল না, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। ১৯৬৫ সালে যেখানে একজন মানুষের বছরে আয় ছিল মাত্র ৫১৬ ডলার, ২০২৫ সালে তা এসে ঠেকেছে প্রায় ৮৫ হাজার ডলারে। অর্থাৎ, আয় বেড়েছে প্রায় ১৬৫ গুণ! মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সিঙ্গাপুর এখন বিশ্বে শীর্ষ ধনী দেশগুলোর একটি। শুধু কি তাই? জনসংখ্যার অনুপাতে এই ছোট্ট দেশটিতেই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কোটিপতির বাস। তাদের সমুদ্রবন্দরটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক বন্দর আর বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হেডকোয়ার্টার এখন এই দেশটিতেই। দুর্নীতির নামগন্ধ নেই বললেই চলে, আর শিক্ষাব্যবস্থায় তারা এখন বিশ্বের কাছে এক অনন্য রোল মডেল।
তাদের কঠোর রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে বাইরের দুনিয়ায় হয়তো অনেক সমালোচনা আছে, বিতর্ক আছে। কিন্তু একটি বিষয় কেউই অস্বীকার করতে পারবে না—মাত্র এক প্রজন্মের চোখের সামনে, কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া, অভাবের তাড়নায় ধুঁকতে থাকা একটি দেশকে এভাবে ঐশ্বর্যশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার দ্বিতীয় কোনো নজির আধুনিক বিশ্বে নেই। সিঙ্গাপুরের এই গল্প শুধু একটি দেশের গল্প নয়, এটি হলো খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অসম্ভবকে জয় করার এক অবিশ্বাস্য অনুপ্রেরণা।
সূত্রঃ স্পেস ডেইলি








