আর্কটিক বৃত্তের নিঃসঙ্গ দ্বীপের জনসংখ্যা ২০, পাখির সংখ্যা ১০ লাখ

উত্তর আটলান্টিকের উত্তাল সমুদ্রের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট এক দ্বীপ, গ্রিমসে। ছবি: সংগৃহীত
উত্তর আটলান্টিকের উত্তাল সমুদ্রের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট এক দ্বীপ, গ্রিমসে। চারপাশে শুধু ধূসর জলরাশি, তীব্র বাতাস আর আকাশজুড়ে অসংখ্য পাখির ওড়াউড়ি। আইসল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে ইউরোপের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন বসতিগুলোর একটি। এখানে মানুষের চেয়ে পাখির আধিপত্য অনেক বেশি। দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র ২০ জন, অথচ সামুদ্রিক পাখির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
দূর থেকে দেখলে গ্রিমসেকে মনে হয় সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে থাকা কালচে পাথরের কোনো দুর্গ। আয়তন মোটে সাড়ে ছয় বর্গকিলোমিটার। কিন্তু এই ছোট্ট ভূখণ্ডই হয়ে উঠেছে লাখো পাখির নিরাপদ আশ্রয়। পাফিন, গিলেমট, রেজরবিল, কালো-পায়ের গাঙচিলসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি বছরের বড় একটা সময় এখানে বাসা বাঁধে।
দ্বীপটির প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি কঠোরও। গ্রীষ্মকালেও এখানে বাতাস এতটাই শক্তিশালী যে হাঁটার সময় শরীর সামলে রাখতে কষ্ট হয়। স্থানীয়রা মজা করে বলেন, গ্রিমসেতে প্রথম শত্রু ঠান্ডা নয়, বাতাস। আর দ্বিতীয় শত্রু আর্কটিক টার্ন নামের ছোট্ট কিন্তু ভয়ংকর সাহসী এক পাখি। এরা নিজেদের বাসার কাছে কাউকে দেখলেই মাথার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই পর্যটকদের অনেকে হাতে লাঠি নিয়ে হাঁটেন। মাটির জন্য নয়, পাখির আক্রমণ ঠেকাতে।
দ্বীপের চারপাশজুড়ে রয়েছে খাড়া ব্যাসল্ট পাহাড়। সেই পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দেখা যায় উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে কালো পাথরে। আর আকাশজুড়ে হাজারো পাখির উড়াউড়ি। অনেক সময় পাফিন পাখিদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে মনে হয় পুরো দ্বীপটাই যেন পাখিদের রাজ্য।
গ্রিমসে আইসল্যান্ডের একমাত্র জনবসতি, যা পুরোপুরি আর্কটিক বৃত্তের মধ্যে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই দ্বীপটি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। শীতকালে এখানে দিনের আলো প্রায় হারিয়েই যায়। ডিসেম্বরের শুরু থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দ্বীপটি ডুবে থাকে অন্ধকারে। তবে সেই অন্ধকারেরও সৌন্দর্য আছে। রাতের আকাশে তখন প্রায়ই দেখা যায় নর্দানলাইট বা সেই বহু কাঙ্খিত সবুজ-নীল আলো।
আবার গ্রীষ্মে ঘটে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। তখন সূর্য প্রায় অস্তই যায় না। রাত গভীর হলেও আকাশে আলো থেকে যায়। এই ‘মধ্যরাতের সূর্য’ দেখতে প্রতি বছর বহু পর্যটক ছুটে আসেন গ্রিমসেতে।
একসময় এই দ্বীপে পৌঁছানো ছিল ভয়ংকর কষ্টসাধ্য। ১৯৩১ সালের আগে বছরে মাত্র দুবার ছোট্ট নৌকায় করে ডাক আসত। ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় সপ্তাহের পর সপ্তাহ দ্বীপটি বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকত। এখন অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। আইসল্যান্ডের আকুরেইরি শহর থেকে ছোট বিমানে মাত্র ২০ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। আর দালভিক গ্রাম থেকে ফেরিতেও আসা যায়, যদিও সমুদ্র শান্ত না থাকলে সেই যাত্রাও বেশ রোমাঞ্চকর।
গ্রিমসের জীবনযাত্রা আধুনিক শহরের মতো নয়। দ্বীপটিতে কোনো হাসপাতাল নেই, নেই পুলিশ স্টেশনও। তিন সপ্তাহ পর পর একজন চিকিৎসক এখানে আসেন। জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয়দেরই দায়িত্ব নিতে হয়। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বিদ্যুতের কোনো সংযোগও নেই। পুরো দ্বীপ ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল।
তবু এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের শান্তি কাজ করে। স্থানীয় গাইড হাতলা ইঙ্গলফসদত্তির কয়েক বছর আগে স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, ‘এখানে নিঃসঙ্গতা আছে, কিন্তু একঘেয়েমি নেই। প্রকৃতি প্রতিদিন নতুন কিছু দেখায়।’
দ্বীপের ছোট্ট বসতি সান্দভিকে কয়েকটি বাড়ি, অতিথিশালা আর একটি ছোট ক্যাফে রয়েছে। সেখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি উলের পোশাক, হাতে বানানো জিনিসপত্র আর স্মারক বিক্রি হয়। একটি ছোট মুদি দোকানও আছে, যা দিনে মাত্র এক ঘণ্টা খোলা থাকে। এত কম মানুষ থাকার পরও এখানে একটি সুইমিং পুল, লাইব্রেরি, চার্চ এবং ছোট বিমানবন্দর রয়েছে।
মজার বিষয় হলো, বিমানবন্দরটি শুধু মানুষের জন্য নয়, পাখিদেরও প্রিয় জায়গা। প্রায়ই রানওয়েতে পাখিদের ভিড় দেখা যায়।
এপ্রিল থেকে আগস্ট এই সময়টাকেই গ্রিমসের প্রাণের মৌসুম বলা যায়। তখন হাজার হাজার পাফিন পাখি দ্বীপে ফিরে আসে। পর্যটকেরাও ভিড় করেন পাখি দেখতে। অনেকে শুধু পাখির ছবি তুলতেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এখানে আসেন।
দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ বিশাল কংক্রিটের ভাস্কর্য, যা আর্কটিক বৃত্তকে চিহ্নিত করে। পর্যটকেরা সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। অনেকে বলেন, পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি পাওয়া যায় সেখানে।
এখন গ্রিমসেতে নতুন কিছু পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। শিল্পী, লেখক এবং সৃজনশীল মানুষদের দীর্ঘ সময় থাকার জন্য কিছু পুরোনো বাড়ি সংস্কার করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়রা চান, উন্নয়ন হলেও দ্বীপের প্রকৃতি যেন নষ্ট না হয়।
সূত্র: বিবিসি ট্রাভেল, ভিজিট আইসল্যান্ড










