আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস
আমাদের দুর্ভাগা বাঘ, হাতি আর চিতা বাঘের গল্প

বামের ছবি: ফিরোজ আল সাবাহ; ডানে টেকনাফের অরণ্যে মা ও বাচ্চা হাতির ছবি: মনিরুল খান, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি: সংগৃহীত
জীববৈচিত্র্য দিবস এলেই আমার কেমন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। ফেসবুকে রঙিন পোস্ট দেখি, বন-জঙ্গল বাঁচানোর আহ্বান দেখি, বাঘ-হাতির ছবি দেখি। আর চোখ বন্ধ করলেই আমি যেন অন্য এক বাংলাদেশ দেখি। সেই বাংলাদেশে রাতের গভীর জঙ্গলে করাত চেরা ডাকে কেঁপে ওঠে বন। পাহাড়ি ঝিরির ধারে বিশাল পায়ের ছাপ ফেলে হেঁটে যায় বাঘ। কুয়াশাভেজা ভোরে বাঁশঝাড় ভেঙে বেরিয়ে আসে দাঁতাল হাতি। আর শালবনের ছায়াঘেরা গাছে গা এলিয়ে ঘুমোয় এক চিতা বাঘ।
সেই বাংলাদেশটার অনেক কিছু এখন আর নেই।
তবু পুরনো গল্পগুলো আমাকে ছাড়ে না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন আরও বেশি তাড়া করে ফেরে। চলুন আজ ২২ মে জীববৈচিত্র্য দিবসে শুনি নতুন পুরনো কিছু আশা-নিরাশার গল্প।
মধুপুরের জলছত্র মিশনের নাম শুনলেই এখনো শিহরণ জাগে শরীরে। যদিও আজ সেখানে গেলে আনারস বাগান আর মানুষের বসতি ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। কিন্তু আমি যেন দেখতে পাই পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের সেই জলছত্রকে। বিশাল শালবন। বুনো গন্ধ। আর ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা চিতা বাঘ।
স্বাধীনতার বছর কয়েক আগের ঘটনা। জলছত্র মিশনের দক্ষিণের পাকা রাস্তার ধারে বিশাল এক বটগাছ। গরমে অতিষ্ঠ এক চিতা উঠে বসেছিল মোটা ডালে। একটু বাতাস বইতেই আরাম করে চোখ বুজেছিল জন্তুটা। কিন্তু সুখ সইল না কপালে। হাটুরেদের একদল দেখে ফেলল তাকে।
খবর গেল শিকারি মনসিনিয়র মাইকেল ডি’কস্তার কাছে। যেখান থেকে বাঘটাকে গুলি করার সুযোগ পেলেন, দূরত্ব বেশ। তারপরও লোকজনের পীড়াপীড়িতে গুলি চালালেন। সৌভাগ্য চিতাটার, গুলিটা লাগল যেখানে বসেছিল তার একটু নিচে। নিঃশব্দে গাছ থেকে নেমে ঝোপের আড়াল নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
এই গল্পগুলো শুনলে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত কষ্ট জমে। কারণ আমরা যারা এখনকার বাংলাদেশ দেখি, তারা কল্পনাই করতে পারি না, এই দেশের বড় একটা অংশ জুড়ে একসময় বাঘ-চিতার রাজত্ব ছিল।
বাঘ-বন-বন্দুক বইয়েও মধুপুরের চিতা বাঘ শিকারের গল্প আছে। জানা মতে, ষাটের দশকের আশপাশ পর্যন্ত মধুপুরে বড় বাঘ ছিল। চিতা বাঘেরা টিকে ছিল আরও কিছুদিন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পরও মাঝেমধ্যে নাকি শোনা যেত তাদের করাত চেরা ডাক।
আমি দিবাস্বপ্ন দেখি— হয়তো আরও অনেক বছর চিতারা টিকে ছিল ওখানে। ধূর্ত জন্তুগুলো হয়তো মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল শিখে ফেলেছিল।
এক সময়ের শিকারি, এখনকার বন্যপ্রাণীপ্রেমী সরওয়ার পাঠান ভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম এক গল্প। বছর ত্রিশ- পঁয়ত্রিশ আগের কথা। গাজীপুরের জঙ্গলের ধারের এক বাড়ির লোকেরা বলত বিশাল এক ‘মেছো বাঘের’ কথা। জন্তুটা নাকি শিকারিদের জালে ধরা পড়ত না কখনো। আমার আজও সন্দেহ— ওটা আসলে মেছো বাঘ ছিল না। মেছো বাঘের ছদ্মবেশে টিকে থাকা গড়ের শেষ চিতা বাঘ ছিল হয়তো!
জানি, এসব কল্পনা। তবু কল্পনাগুলো আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে।
কারণ বাস্তব বড় নির্মম।
মধুপুরের জঙ্গল আমরা এমনভাবে ছোট করেছি, চারপাশে বসতি গড়েছি, বন কেটেছি যে সেখানে চিতা বাঘ ফিরে আসার সুযোগই প্রায় শেষ।
তবে বাংলাদেশের চিতাদের গল্প এখানেই শেষ নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বন-পাহাড়ে এখনো মাঝেমধ্যে ভেসে আসে চিতা বাঘের খবর। গবেষক শাহরিয়ার সিজার রহমান, সুপ্রিয় চাকমা, সৌরভ চাকমাদের ক্যামেরা ট্র্যাপ নিশ্চিত করেছেন— অন্তত কয়েকটি এলাকায় এখনো চিতার ছোট ছোট বসতি আছে। সংখ্যাটা খুব কম। তবু আছে।
এই ‘আছে’ শব্দটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
সিলেটের সীমান্তঘেঁষা জঙ্গল থেকেও কখনো-সখনো চিতার খবর আসে। কক্সবাজারের বিপর্যস্ত বনেও হয়তো দু-চারটি টিকে আছে। কখনো মনে হয় শেরপুর-নেত্রকোনা-জামালপুরের গারো পাহাড়েও হয়তো লুকিয়ে আছে শেষ কয়েকটি চিতা বাঘ।
তারপরই বুক কেঁপে ওঠে ভয়ংকর এক আশঙ্কায়।
কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসব এলাকায় এখনো চিতা বাঘ আছে, সেখানেই চলছে নির্বিচারে গাছকাটা, শিকার, পাহাড় ধ্বংস। ভারতের বন বিভাগ তাদের প্রতিটি জঙ্গলে চিতা বাঘের সংখ্যা জানে। আর আমরা এখনো একটা পূর্ণাঙ্গ জরিপও করতে পারিনি!
এত সুন্দর একটা প্রাণী। অথচ কী অবহেলা!
বাঘদের গল্প আরও বেদনাদায়ক।
আসামের মানস ন্যাশনাল পার্ক-এ ২০১০ সালে বাঘ ছিল ১৬টির মতো। ২০১৯ সালে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২-এ। গত কয়েক বছরে সংখ্যাটা আরও বেড়েছে। গন্ডারও ফিরে এসেছে সেখানে। শুনে আনন্দ হয়েছিল। আবার বুকের ভেতর হাহাকারও উঠেছিল।
কারণ সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অদেখা, কিংবদন্তির বাঘদের কথা।
অনেকে হয়তো ভাববেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আবার বাঘ ছিল নাকি?
ছিল।
মনিরুল খানের টাইগারস ইন দ্য ম্যানগ্রোভস বইয়ে ২০১১ সালেও তাজিংডং পাহাড়ে বাঘ শিকারের উল্লেখ আছে। কাসালং রিজার্ভেও বাঘ দেখা যাওয়ার তথ্য মিলেছে। বড় মোদক এলাকায় এক ত্রিপুরা শিকারির হাতে দুই বাঘ মারা পড়ার গল্পও পড়েছি বিভিন্ন লেখায়।
মানে খুব বেশিদিন আগেও পাহাড়ে বাঘ ছিল।
একসময় বাংলাদেশের বহু বনেই ছিল তাদের রাজত্ব।
লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান-এ রাতের অন্ধকারে বাঘ দেখেছিলেন প্রকৃতিবিদ নওয়াজেশ আহমদ। ষাটের দশকে সেখানে বাঘ মারা হয়েছিল। এনায়েত মওলা তার যখন শিকারি ছিলাম বইয়ে সিলেট ও কাসালংয়ের বাঘ শিকারের অসংখ্য কাহিনি লিখেছেন।
বইটা পড়ার পর কাসালংয়ে গিয়েছিলাম কয়েকবার। মাইনি বন বাংলোর পুরনো ভিজিটরস বুক ঘাঁটতে গিয়ে এক ইংরেজ মহিলার লেখা দেখে চমকে উঠেছিলাম— ‘আজ একটা বেঙ্গল টাইগার মেরেছি।’
একটা সময় বাঘ মারা ছিল গর্বের বিষয়।
আজ একটা বাঘের অস্তিত্বের খবর পেলে আমরা আশায় বুক বাঁধি।
এটাই আমাদের ট্র্যাজেডি।
তবু আমি পুরোপুরি হতাশ হতে পারি না।
সাজেকের সীমান্তঘেঁষা ভারতের ডামপা টাইগার রিজার্ভ-এ শেষ জরিপে বাঘ না মিললেও সাঙ্গু-মাতামুহুরির জঙ্গলে কয়েকবছর আগেও ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে বাঘের পায়ের ছাপ। পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষজনের কাছ থেকেও মাঝেমধ্যে অদ্ভুত সব গল্প শুনি।
আমার বিশ্বাস, সীমান্তের এপাশ-ওপাশ মিলিয়ে হয়তো এখনো কয়েকটি বাঘ টিকে আছে।
হয়তো কোনো গভীর পাহাড়ি অরণ্যে এখনো রাতের আঁধারে হেঁটে বেড়ায় একাকী কোনো বাঘ।
তারপর আসে হাতিদের কথা।
আমাদের সবচেয়ে দুর্ভাগা বন্যপ্রাণী সম্ভবত বুনো হাতি।
বিশ্বে আফ্রিকান হাতি আছে চার লাখের বেশি। এশীয় হাতি আছে ৫০ হাজারেরও কম। বাংলাদেশের অবস্থা আরও করুণ। একসময় সাজেক, রেমাক্রি, মদক— এসব জায়গায় বিশাল হাতির পাল ঘুরে বেড়াত। কাসালং রিজার্ভে নাকি একশ হাতির পাল ছিল। আর এখন পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বুনো হাতি আছে পঞ্চাশের কিছু বেশি।
ভাবা যায়?
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অঞ্চলেও হাতির অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবির তৈরি হওয়ার পর হাতির চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের ফাঁদ, গুলি, বন ধ্বংস— সব মিলিয়ে ওরা যেন দিশেহারা।
মানুষ মারা গেলে আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হই। কিন্তু একবারও ভাবি না, হাতিদের চলার পথ আমরা দখল করেছি। পাহাড় কেটেছি। বন উজাড় করেছি। তাদের খাবার কেড়ে নিয়েছি।
দোষটা তাহলে কার?
সবচেয়ে ভয় লাগে নতুন রেলপথ নিয়ে। ভারতে গত দশ বছরে ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে দুইশ’র বেশি হাতি। আমাদের দেশেও এরই মধ্যে ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মারা গেছে।
আজ জীববৈচিত্র্য দিবসে তাই বারবার মনে হচ্ছে— আমরা কি সত্যিই বুঝতে পারছি কী হারাচ্ছি?
একটা বাঘ হারানো মানে শুধু একটা প্রাণী হারানো নয়। একটা বন হারানো। একটা ইতিহাস হারানো। একটা সভ্যতা হারানো। একটা চিতা বাঘ হারানো মানে পুরনো সব রোমাঞ্চকর স্মৃতির মৃত্যু।
একটা দাঁতাল হাতি হারানো মানে পাহাড়ি অরণ্যের আত্মা হারিয়ে যাওয়া।
তবু আশ্চর্যভাবে আমি এখনো আশাবাদী।
কারণ ভারতের মানাসে বাঘ ফিরেছে। ভারতের অরণ্যে চিতা (চিতা বাঘ) ফিরেছে। পৃথিবীর বহু জায়গায় মানুষ চাইলে বন্যপ্রাণীকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।
আমরাও পারব।
যদি পাহাড়ের বনগুলোকে সত্যিই বাঁচাতে চাই।
যদি শিকার বন্ধ করতে পারি।
যদি স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করা যায়।
যদি বিজ্ঞানভিত্তিক জরিপ করা হয়।
যদি অন্তত এখনই বুঝতে পারি— বাঘ, চিতা, হাতি ছাড়া এই দেশটা অসম্পূর্ণ।
হয়তো একদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো পাহাড়ি ঝিরির ধারে আবার মিলবে বাঘের পায়ের ছাপ।
হয়তো কোনো ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়বে অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া চিতা। হয়তো কোনো কুয়াশাভেজা ভোরে বাঁশঝাড় কাঁপিয়ে বেরিয়ে আসবে দাঁতাল হাতি। আর নির্বিঘ্নে শেরপুর ও কক্সবাজারের অরণ্যে বাচ্চাসহ ঘুরে বেড়াবে মাদি হাতি।
সেই দিনের আশাতেই বোধহয় এখনো বন নিয়ে লিখি। এখনো পুরনো শিকার কাহিনি পড়তে গিয়ে বুক হুহু করে ওঠে। এখনো মনে হয়— সব শেষ হয়ে যায়নি।
হয়তো বাংলাদেশের জঙ্গলগুলো এখনো পুরোপুরি হার মানেনি মানুষের কাছে।







