ট্রাম্প চাইছেন ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে চুক্তি, পুতিনের চাওয়া রাশিয়ার জয়

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পুতিন অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার লক্ষ্য দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানো। এতে একদিকে প্রাণহানি কমবে, অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের লক্ষ্য ভিন্ন। ইউক্রেনে নিজের ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে তিনি এখনো অনড়। ফলে ট্রাম্পের সমঝোতার চেষ্টা বারবার পড়ছে বাধার মুখে।
যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতে প্রাণহানি থামানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও বড় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে লাভজনক বাণিজ্য চুক্তির পথ খুলবে। কিন্তু অর্থনৈতিক সুবিধার প্রস্তাব পেলেও ইউক্রেন নিয়ে নিজের অবস্থান বদলাতে রাজি নন পুতিন।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত অবসান একটি সহজ সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি কমবে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে। তার ধারণা, শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এতে অর্থনৈতিক লাভও অনেক।
কিন্তু ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নন, পুতিনই দেশটির নেতৃত্বে রয়েছেন। এক্ষেত্রে ইউক্রেন যুদ্ধে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি পুতিন। যুদ্ধ বন্ধ হলে মানুষের প্রাণ বাঁচবে এবং রাশিয়ার অর্থনৈতিক লাভও হতে পারে। তবু নিজের অবস্থান বদলাতে রাজি নন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার পেছনে এই মৌলিক ভুল বোঝাবুঝি কাজ করছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে মস্কোকে সমঝোতায় আনা সম্ভব। কিন্তু ক্রেমলিন এসব প্রস্তাবকে যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে দেখছে না।
সম্প্রতি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। একসময় ট্রাম্পের ব্যবসায়িক ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত উইটকফ এখন তার প্রধান আলোচকদের একজন।
বৈঠকে পুতিন আগের দিন নরওয়েতে অনুষ্ঠিত আলোচনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটোর কর্মকর্তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে মস্কোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিষয়ও ছিল।
পরে ক্রেমলিনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের দূত বৈঠকের আলোচনাগুলো পুতিনকে জানিয়েছেন। তবে তার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে এসব আলোচনায় তেমন কার্যকর কোনো প্রস্তাব ছিল না।
রাশিয়ার অবস্থান বিবেচনায় এমন প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিত নয়। মস্কো পূর্ব ইউক্রেনের পুরো দনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চায়। পাশাপাশি ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারণেও নিজেদের ভূমিকা রাখতে চায়। এসব দাবিতে রাশিয়া এখনো অনড়।
সম্প্রতি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কম রাখার রাজনৈতিক লক্ষ্য এতে কাজ করেছে। তবে সিদ্ধান্তটি রাশিয়ার জন্যও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে।
এরপর ট্রাম্প জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব দেন। এর আওতায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নিয়েও তৈরি হয় টানাপড়েন। ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের আহ্বানও জানান। এসব ঘটনা মস্কোর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাশিয়ার দৃষ্টিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, অর্থনৈতিক সুবিধার প্রস্তাব এবং কিয়েভের নেতৃত্বের সমালোচনা, এসব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় মস্কোর কৌশল সফল হওয়ার লক্ষণ। তাই ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী ছাড় দেওয়ার বদলে পুতিন নিজের অবস্থান ধরে রাখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পুতিন অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাচ্ছেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের বৈঠকেও তিনি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সার রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্র, জ্বালানি ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনার কথা বলেছেন রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ক্রেমলিনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকারী কিরিল দিমিত্রিয়েভ।
তিন ঘণ্টার বৈঠক শেষে দিমিত্রিয়েভ এসব সম্ভাব্য প্রকল্পের কথা জানান। অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাবের মাধ্যমে মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সুযোগ তৈরি করতে চাইছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্যিক লাভ নয়। ট্রাম্পের আগ্রহ ও ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো বুঝে সেগুলোকে কাজে লাগানোও পুতিনের কৌশলের অংশ। অর্থনৈতিক চুক্তির সম্ভাবনা দেখিয়ে তিনি হোয়াইট হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখছেন, অথচ ইউক্রেন নিয়ে নিজের অবস্থান বদলাচ্ছেন না।
সেন্ট পিটার্সবার্গের বৈঠকের আগে ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয় রাশিয়া। ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর সময় তাকে আটক করা হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি রাশিয়ার একটি প্রত্যন্ত কারাগারে বন্দি ছিলেন।
মিশিগানের বাসিন্দা হাবার্ড বন্দিজীবনের চার বছরে গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগেছেন বলে জানা গেছে। তার মুক্তিকে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় পুতিনের সদিচ্ছা হিসেবে তুলে ধরেছেন উইটকফ। তিনি পুতিনের এ পদক্ষেপকে ‘মানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউজও হাবার্ডের মুক্তিকে ট্রাম্পের চুক্তি করার দক্ষতার সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিময়ে কিছু দিতে হয়নি। বিবৃতিতে একে রাশিয়ার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে ক্রেমলিনের সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা পুতিন ঘটনাটিকে এভাবে দেখছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।ট্রাম্পের কাছে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান মানে প্রাণহানি থামানো, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লাভজনক বাণিজ্যের পথ তৈরি করা। কিন্তু পুতিনের কাছে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনই এখনো প্রধান বিষয়।
একদিকে মস্কোকে অর্থনৈতিক সুবিধার প্রস্তাব দিয়ে সমঝোতায় আনার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে পুতিন এসব প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে নয়। ফলে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চললেও দুই পক্ষের অগ্রাধিকারের ব্যবধান স্পষ্ট থাকছে।
সূত্র : সিএনএন






