ব্রিকস মঞ্চে শি’র বার্তা
জোর যার মুল্লুক তার এই দিন শেষ
- যুক্তরাষ্ট্রকে মোড়ল মানবে না ইরানও
- প্রযুক্তি ও খনিজকে অস্ত্র বানালে উন্নয়নের গতি থমকে যেতে পারে সতর্কতা মোদির

সংগৃহীত ছবি
যুদ্ধ ও সংঘাতের অভিঘাত, বাণিজ্যিক চাপ এবং শক্তিধর দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তের মধ্যেই নয়াদিল্লিতে শেষ হলো দুদিনের ব্রিকস সম্মেলন। গতকাল রবিবার সমাপনী দিনের আলোচনায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বার্তা— আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘জোর যার, মুলুক তার’ চলতে পারে না, নিয়ম সবার জন্য সমান হতে হবে। একই মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সতর্ক করলেন, প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে ‘অস্ত্র’ বানালে উন্নয়নের গতি থমকে যেতে পারে। ফলে ব্রিকসের শেষ দিনে অর্থনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে জুড়ে গেল যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আইন, প্রযুক্তি এবং ভূরাজনীতির প্রশ্নও।
দ্বিতীয় দিনের নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ভারত মন্ডপমে শুরু হয় শেষ দিনের মূল অধিবেশন। তার আগে নেতারা সেখানে পৌঁছান এবং ‘পারিবারিক ছবি’র পর শুরু হয় ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্ব— অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ’ নিয়ে আলোচনা। দিনটির আলোচনার মূল বিষয় ছিল, ভারতের সভাপতিত্বের চার স্তম্ভকে সামনে রেখে ব্রিকসের সহযোগিতাকে বাস্তব কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়া। বেলা ২টা ২২ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি সমাপনী বক্তব্য দেন এবং ভারতের সভাপতিত্বের পরবর্তী দায়িত্ব তুলে দেন চীনের হাতে। অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনের মূল সম্মেলনটি প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো চলে। তবে সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভিত তৈরি হয়েছিল আগের দিনই। গত শনিবার ব্রিকস নেতারা সর্বসম্মতভাবে ৪৫ পাতার ১৪০ দফার নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেন। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও সংঘাত, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বাধা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে সেখানে ব্রিকসের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
গতকালের আলোচনায় মোদি বলেছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। মহামারী, জলবায়ু বিপর্যয় কিংবা সরবরাহ-শৃঙ্খলের ধাক্কা— কোনো সংকটই এখন আর একটি দেশের মধ্যে আটকে থাকে না। ব্রিকসকে সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেন প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ‘অস্ত্রায়ন’ নিয়ে। তার বক্তব্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বা প্রয়োজনীয় খনিজকে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার করা হলে সম্মিলিত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এরপর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্ব দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ডাক দেন। আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌম সমতা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে মেটানোর নীতি রক্ষার কথা বলেছেন তিনি। তার বক্তব্যের মূল সুর— আন্তর্জাতিক নিয়ম কোনো একটি দেশের ইচ্ছায় তৈরি হবে না। সব দেশের অংশগ্রহণে নিয়ম তৈরি করতে হবে এবং সেই নিয়মের প্রয়োগেও দ্বৈত মানদণ্ড রাখা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লগিরি না মানার সুরে আগের দিন ঠিক সেই কথাই বলেছে মিত্র ইরানও। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান চড়া স্বরে বলেছিলেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের চাপের সামনে মাথানত করবে না ইরান। ১১ সেপ্টেম্বর রাতে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের চাপের কাছে ইরান মাথানত করবে না। বিদেশি শক্তি ইরানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না বলেও বার্তা দেন তিনি। পরদিন শেষ দিনের আলোচনায় অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নও তোলেন পেজেশকিয়ান। তার বক্তব্য, ব্রিকস দেশগুলোর নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং নতুন উন্নয়ন ব্যাংককে আরও শক্তিশালী করা দরকার। অতিরিক্তভাবে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে রাজনৈতিক চাপের কাছে দুর্বল করে তুলতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিকসকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বিশ্ব পরিচালনার কাঠামোয় আরও কার্যকর ভূমিকা দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্রিকসের প্রভাব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নতুন বীমাব্যবস্থা এবং শস্যবাজারের মতো ক্ষেত্রেও প্রস্তাব রাখেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
দুদিনের সম্মেলন শেষে ব্রিকসের সভাপতিত্ব চীনের হাতে তুলে দেয় ভারত। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, শুধু ঘোষণা বা নথিতে আটকে না থেকে সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলোকে সময়সীমা বেঁধে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। তার ভাষায়, ব্রিকস শুধু কয়েকটি দেশের জোট নয়। এটি সমাধানের একটি পরিসর হয়ে উঠছে।
সম্মেলন শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রনেতারাও একে একে দিল্লি ছাড়তে শুরু করেন। গতকাল দুপুরের আগেই নয়াদিল্লি ছাড়েন শি জিনপিং। তার সফরটি ছিল প্রায় ২৪ ঘণ্টার। প্রায় একই সময়ে দিল্লি ত্যাগ করেন পুতিনও। পুতিনের রওনার খবর দুপুর ১টা ৪৪ মিনিটে এবং শির বিদায়ের খবর তার কিছু আগে প্রকাশিত হয়। পেজেশকিয়ানসহ সফরে আসা সব নেতারই দিল্লি ছাড়ার কথা গতকালই। এনডিটিভি, দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস।



