তিন নির্বাচনে শক্তির বিরুদ্ধে মানুষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শাসকের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা; বিক্ষোভ-বিদ্রোহের পাঠশালায় রাজা-মহারাজাদের ভীমরতি উড়িয়ে দেওয়ার চল আজ নতুন নয়। হাজার বছরের পুরনো। মিসরের মহাপরাক্রমশালী পঞ্চম রাজবংশ তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। ফারাও ইতিহাসের ওল্ড কিংডম। মানব ইতিহাসের প্রথম গণবিদ্রোহের সূচনা। খ্রিস্টের জন্মেরও আড়াই হাজার বছর আগের গল্প। টানা ১৫০ বছরের বেশি সময় হাতের মুঠোয় নাচিয়েছিল মিসরকে। আনুমানিক ২৫০০-২৩৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। বর্তমানের হিসাবে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর। সে সময় রাজা-পুরোহিততন্ত্রের চরম অত্যাচার ও ধর্মীয় অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন সাধারণ মানুষ। পতন হয় মিসরের প্রবল পরাক্রান্ত, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ওল্ড কিংডমের। তখন নির্বাচন ছিল না; আসেনি ব্যালটও। একটিই অস্ত্র ছিল হাতে— বিদ্রোহ। ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ‘আরব ওয়ার্ল্ড বুকস ম্যাগাজিন’-এর ‘ইজিপ্ট ফার্স্ট রেভল্যুশন’ নিবন্ধে উঠে এসেছে গণমানুষের শতবর্ষের সে পঞ্জীভূত ক্ষোভ।
অর্থাৎ ক্ষমতার দম্ভ যখন আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, প্রাসাদের দেয়াল লাফিয়ে সাম্রাজ্যের অলিগলি ছাপিয়ে পুরো মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়ে শাসকের দৌরাত্ম্য; ঠিক তখনই খাদের কিনারা থেকে জেগে ওঠেন সাধারণ মানুষ! দেয়ালে ঠেকা পিঠ নিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় শক্তির (রাষ্ট্রশক্তি) বিরুদ্ধে। ধুলোয় মিশিয়ে দেয় রাজতালুক; রাজাসম্রাট, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর হালুম-হুলুম দম্ভ। চলতি বছরের অক্টোবর মাসটিও বিশ্ব রাজনীতির ক্যানভাসে ঠিক তেমনই এক ইতিহাস। কালচিত্র হয়ে ঝুলবে কালের সরণিতে। লাতিন আমেরিকার আমাজন অববাহিকা থেকে বলকানের দানিউব নদী; ওদিকে ভূমধ্যসাগরের তীরে জেরুজালেমের প্রাচীন দেয়াল— রাজনৈতিক বসন্তের সাক্ষী হলো তিন ভিন্ন গোলার্ধের তিন দেশ। যেন এক সুতোয় বাঁধা এক অভূতপূর্ব নির্বাচন। ব্রাজিল, সার্বিয়া এবং ইসরায়েল। একেবারেই কাছাকাছি সময়। ক্যালেন্ডারের সীমানায় গায়ে গা লাগোয়া দিন। ব্রাজিল, সার্বিয়ায় ২৫ অক্টোবর। ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে। তিন দেশের এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার রদবদল ছিল না; ছিল স্বৈরতান্ত্রিক অহমিকা ও কট্টর ডানপন্থী পপুলিজমের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের আদিম, অদম্য স্বাধীনতার চিরাচরিত প্রতিবাদ।
কারখানার ঘাম মাখা; কুঁড়েঘরের শ্রমিকনেতা থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন তার নিখাদ প্রমাণ। স্বজনতোষণ, ঘুষ-দুর্নীতি, পরদেশি মধুতে ফুলেফেঁপে ওঠা কট্টর ডানপন্থা, আর বনখেকো করপোরেট লোভের করাত থেকে মুক্ত করেছে আমাজন ভূমিকে। তথা লাতিন আমেরিকার প্রাণভোমরা ব্রাজিলকে। ৬ কোটি ৪২ লাখের বেশি ভোটে হারিয়েছেন ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থী শক্তিকে। ভিনদেশি প্রিয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্ল্যাভিও বলসোনারোকে। ৪৫ বছরের সুঠাম যুবক ফ্ল্যাভিওকে ফেলে জনগণ আবারও বেছে নিয়েছে ৮১ বছর বয়সী পড়ন্তবেলার সেই মহানায়ককেই! ভোটের দিনে বলসোনারো বাহিনীর প্রতিবন্ধকতাও মানেনি। সব বাধা ভেঙে বুথে আসে প্রায় ৮০.৮ শতাংশ ভোটার। বিজয় ভাষণের রাতে সাও পাওলোর অ্যাভেনিডা পাউলিস্টা সড়কের চিত্রই বলে দেয় সে কথা। প্রিয় নেতাকে একপলক দেখতে, তার মুখের দুটো কথা শুনতে জড় হয়েছিলেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। শুধু ব্রাজিল নয়, রাষ্ট্রের উগ্রশক্তি দমনের সে বিজয়উল্লাসে সেদিন চমকে উঠেছিল পুরো বিশ্বই। হয়তো ভেতরে ভেতরে ঘাম ছুটছিল দূরদর্শনে চোখ পেতে রাখা পশ্চিমা দুনিয়ার তাবড় তাবড় সব রাষ্ট্রনায়কেরও। দুদিন পরই ভিটেবাড়ি ফেলে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ফ্ল্যাভিও। অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রে সাজাপ্রাপ্ত আসামি বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো তো আগেই গৃহবন্দি!
ঠিক একই খেলা দেখিয়েছে সার্বিয়ার তরুণ ছাত্র-জনতাও। ১৪ বছরের টানা অবদমনও তরুণদের স্বপ্নের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারেনি। বেলগ্রেডের রাজপথ নিজেই প্রমাণ করেছে সে অমোঘ সত্য। গণতন্ত্রের মুখোশে অক্টোপাসের মতো দেশের শাসনযন্ত্রের গলাচেপে ধরা ৫৬ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিসকে রাজকীয় ‘ভিলা মির’ প্যালেস থেকে ছুড়ে ফেলেছে আস্তাকুঁড়ে। হাতেগোনা মাত্র দুই বছরের আন্দোলন। আর এতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ভুচিসের মসনদ। যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর সার্বিয়ার ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ ভোটার আসেন ভোটকেন্দ্রে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের রেকর্ড উপস্থিতি। দলমত ভেঙে বুথে। উদ্দেশ্য একটাই— ভুচিস হটাও।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় ঘটেছে ইসরায়েলে। অন্দরমহলে আগুন। ঘরের ভেতরেই ‘বিদ্রোহ’। মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে নেসেটের নির্বাচনে এবার শতাব্দীর সবচেয়ে বড় নীরব বিপ্লব দেখল পুরো বিশ্ব। ১৯ বছরের বেশি সময়ের শাসনে ইসরায়েলকে জাত-বিদ্বেষের নাগপাশে মুড়ে ফেলা দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আরব ফিলিস্তিনিদের রেকর্ড ভোট। ইসরায়েলের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। একলাফে ৮০ শতাংশ উপস্থিতি! যা প্রমাণ করে, মানচিত্র থেকে নাম মুছে দিলেও নিভিয়ে ফেলা যায় না মানুষের বুকের আগুন। রাষ্ট্রযন্ত্রের গোয়েন্দা নজরদারি, পুলিশি বুট আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বিভাজনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়েছে দেশগুলো। বিশ্ব গণতন্ত্রের ক্রান্তিলগ্নে এই তিন দেশের বিপ্লব আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয় ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ১৯৭৬ সালের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘যেখানেই ক্ষমতা থাকে, সেখানেই প্রতিরোধ জন্ম নেয়’ (হয়্যার দেয়ার ইজ পাওয়ার, দেয়ার ইজ রেজিস্ট্যান্স)। ক্ষমতার ‘শক্তি’ সাময়িক জয়ী হলেও, দিনশেষে ইতিহাসের শেষ তুলির আঁচড়টি কিন্তু সাধারণ ‘মানুষের’ হাতেই। স্বৈরতন্ত্রের পাথর যত ভারীই হোক না কেন, গণতন্ত্রের ঘাস ঠিকই তার বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়ায়। গর্জে ওঠে শক্তির বিরুদ্ধে। গুঁড়িয়ে দেয় শাসকের দম্ভ। সে দৃশ্যই এবার ফুটে উঠেছে হাজার হাজার মাইল দূরের তিন ভূখণ্ডে।
নিপীড়িত আরব ফিলিস্তিনিদের উত্থান
ইসরায়েলের সরকার ব্যবস্থায় জন্মের পর থেকেই নির্যাতিত হয়ে আসছেন আরব ফিলিস্তিনিরা। ১৯৪৮ সাল থেকেই। নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরেই থেকে গিয়েছিলেন তারা। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ২০ লাখই আরব ফিলিস্তিনি। অধিকাংশই মুসলিম। একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও অধিকারের বেলায় দ্বৈত নীতি চালু করে নেতানিয়াহু সরকার। দীর্ঘ শাসনকালে (বিশেষ করে ২০০৯-২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে) আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্য শুধু বৃদ্ধিই পায়নি; বরং তা পদ্ধতিগত এবং রাষ্ট্রীয় রূপ ধারণ করেছে। স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘আদালাহ’-এর মতে, ইসরায়েলের ইতিহাসে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটগুলোই ছিল সবচেয়ে উগ্র ডানপন্থী সরকার। যার অধীনে আরবদের অধিকার হরণকারী অর্ধেকের বেশি বৈষম্যমূলক আইন পাস করা হয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকারের সবচেয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল ২০১৮ সালে পাস করা ‘ইহুদি জাতি-রাষ্ট্র’ নামক মৌলিক আইনটি। এই আইনবলে আরব ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ঘোষণা করেন নেতানিয়াহু।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক বর্ণবাদবিরোধী ফিলিস্তিনি অধিকার রক্ষাকারী সংস্থা হিসেবে পরিচিত ইনস্টিটিউট অব মিডলইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে সে চিত্র। ২০১১ সালে ‘ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনেস্ট প্যালিস্টিনিয়ান সিটিজেনস অব ইসরায়েল’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করে এমন ৫০টির বেশি আইন রয়েছে ইহুদি-অধ্যুষিত এ দেশটিতে। ৭০টির বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও সম্প্রদায় রয়েছে (যার কিছু কিছু ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগের), যেগুলোকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি সরকার। চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা সবখানেই বঞ্চিত। এমনকি ফুটবল খেলার মাঠেও প্রকাশ্যে ‘আরবদের হত্য করো’ স্লোগান দেয় কট্টর ইহুদিরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেও দেখে না স্থানীয় প্রশাসন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ইহুদিদের জন্য ৬০০টির বেশি নতুন পৌরসভা বা শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইসরায়েলে। অথচ আরবদের জন্য একটি নতুন শহর বা সম্প্রদায়কেও রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েলি সরকারের সম্পদ ও বাজেটগুলোর সিংহভাগই অসমভাবে ইহুদিদের দিকে চালিত হয়, আরবদের দিকে নয়। আরব স্কুলগুলোর জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ ইহুদি স্কুলগুলোর তুলনায় অনেক কম। ২০০৪ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরকার একজন ইহুদি শিক্ষার্থীর পেছনে একজন আরব শিক্ষার্থীর তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়। এখানেই শেষ নয়।
আরবদের বাড়িঘর ধ্বংস করাকে নিজের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন নেতানিয়াহুর জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির। চলতি বছরের অক্টোবরের ঘটনা। নেগেভ মরুভূমির আল-ধাহিয়া বেদুইন ফিলিস্তিনি গ্রামের ৮০টি বাড়ি ভেঙে ৪০০ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেন বেন গভির। এমন হাজারো পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ঝড় উঠেছে এবার ২৬তম সাধারণ নির্বাচনে। বুথফেরত জরিপ বলছে, ১২০টি আসনের নেসেটে এবারই রেকর্ড ১৯টি আসনে জয় পেতে চলেছে আরব জোটের জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম। নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির ব্লক পেয়েছে ৫৩ আসন। ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোটের ব্লক পাচ্ছে ৪৮ আসন। সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ৬১ আসন রীতিমতো আরবদের কোর্টে। ৪ নভেম্বর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর নতুন কোয়ালিশন সরকার গঠনে সর্বোচ্চ ৪২ দিন (২৮ দিন + অতিরিক্ত ১৪ দিনের বর্ধিত সময়) প্রাথমিক সুযোগ পাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলো। অর্থাৎ শক্তির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা নিপীড়িত মানুষগুলোর হাতেই যে এবার ইসরায়েলে রাষ্ট্রশক্তির চাবি, তা মোটামুটি নিশ্চিত।
সার্বিয়ার স্বৈরাচারী দুর্গের পতন
বলকান রাষ্ট্র সার্বিয়ায় যা ঘটেছে, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক নতুন রূপকথা ! ১৪ বছর ধরে দেশটির রাজনীতি ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন পপুলিস্ট ও জাতীয়তাবাদী নেতা আলেকসান্ডার ভুচিস। নিজের ক্ষমতা আরও পোক্ত করতে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, ক্ষোভের আগুন কতটা তীব্র ছিল পর্দার আড়ালে ! এবারই সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির রেকর্ড হয়। কোনো প্রথাগত বিরোধী দল যেখানে ৩ শতাংশ ভোটের কোটা পার হতে পারেনি, সেখানে ছাত্ররা এককভাবে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ভুচিকের শক্তিশালী প্রোগ্রেসিভ পার্টিকে (৩৮.৮ শতাংশ ভোট) ধূলিসাৎ করে দেয়। ২৫০টি আসনের ১৪০টিতেই ভূমিধস জয়! বেলগ্রেডের স্লাভিয়া স্কয়ারে লাখ লাখ মানুষের বিজয়োল্লাস সেদিন আরও একবার প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় ভীতি ও পুলিশি বেষ্টনীকে উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ‘ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা’ বেছে নিয়েছেন মানুষ।
সেদিনই প্রকাশ্য টেলিভিশনে পরাজয় স্বীকার করে নেন ভুচিক। সব থেকে হাস্যকর বিষয় হলো, রাজধানী বেলগ্রেডের ভোটারস্রোতে নিজের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে ২ ঘণ্টা জ্যামে পড়তে হয়ে ভুচিককে। পতনের শুরুটা ২০২৪ সালে। নোভি সাদ শহরে একটি রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে সেদিনের যে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অবহেলার চিত্র সামনে আসে, তা থেকে গড়ে ওঠে ছাত্র আন্দোলন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। মাত্র দুই বছর আগে উঁকি মারা তরুণ নেতৃত্বাধীন এই গণশক্তিতেই গণতন্ত্রের আড়ালের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পায় সার্বিয়া।
নির্বাচনী স্বৈরশক্তির উত্থান, গণতন্ত্রের বিলুপ্তি
আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল ডাইনোসর। একবিংশ শতাব্দীর এই ক্রান্তিলগ্নে এসে সে পথেই হাঁটছে বিশ্ব শাসনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল— গণতন্ত্রও। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত সুইডেনভিত্তিক বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বের ৬০০ কোটি মানুষের দিন কাটছে স্বৈরশাসনে। মাত্র ৬০ কোটি মানুষ রয়েছেন পূর্ণ গণতন্ত্রে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র জাহির করা ভারত থেকেই উড়ে গেছে গণতন্ত্রের পাখি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনে গণতন্ত্র থেকে ছিটকে পড়েছে বিশ্বের প্রাচীন গণতন্ত্রের দেশ যুক্তরাষ্ট্রও। গত ৫০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ‘উদারপন্থী গণতন্ত্র’-এর মর্যাদা হারিয়েছে দেশটি। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেশ এখন স্বৈরতন্ত্রীকরণের কালো তালিকায়। যার মোট সংখ্যা ৪৪টি দেশ। এর মধ্যে সরাসরি স্বৈরতন্ত্রের দিকে ছুটছে ২৪টি দেশ। ২০টি দেশ গণতান্ত্রিক পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত। ২০২৫ সালে স্বৈরতন্ত্রীকরণের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ১০টি নতুন দেশ। নতুন স্বৈর দেশের ৫টিই ইউরোপের। ক্রোয়েশিয়া, ইতালি, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া এবং যুক্তরাজ্য। ৪২শর বেশি পণ্ডিত নিয়ে গঠিত ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের এ গবেষণা প্রতিবেদনে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়েছে গণতন্ত্রকে। উদারপন্থী গণতন্ত্র, নির্বাচনী গণতন্ত্র, নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র ও পূর্ণস্বৈরতন্ত্র। অর্থাৎ পেশিশক্তি বা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশকেও রাখা হয় পূর্ণ স্বৈরতন্ত্রের তালিকায়।



