ব্রেক্সিট যেভাবে দরিদ্র করেছে ব্রিটেনকে

ডোভারের দিকে এ২০ সড়ক দিয়ে ট্রাকগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। অনিশ্চয়তার কারণে বাণিজ্যিক চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকেরা এর সুবিধা নিতে পারেননি। ছবি: সংগৃহীত
এক দশক পূর্ণ হতে চলল ব্রেক্সিট গণভোটের। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে বেরিয়ে আসার যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব এখন অনেকটাই স্পষ্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির অর্থনীতি, ব্যবসাসহ চাপ সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির চিত্রই বেশি দৃশ্যমান।
ব্রেক্সিট গণভোটের আগে তাৎক্ষণিক মন্দার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন। এটি পরিচিত হয়েছিল ‘প্রজেক্ট ফিয়ার’ নামে। তবে বাস্তবে ঘটেনি।
একইভাবে কোভিড মহামারি, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির মতো বৈশ্বিক ঘটনাও জটিল করেছে অর্থনীতির চিত্রকে।
তবে বিশেষজ্ঞরা একমত, দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস সঠিক ছিল। ব্রেক্সিট না হলে অর্থনীতি যত বড় হতো, তার চেয়ে এখন তা অনেক ছোট। এতে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা স্থবির, আর বছরে গড়ে হাজার হাজার পাউন্ড ক্ষতির মুখে পড়েছে পরিবারগুলো।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক ডেপুটি গভর্নর চার্লি বিন মন্তব্য করেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক পূর্বাভাসকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন অসবর্ন। দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ মোটামুটি সঠিক ছিল। আমরা এখন আগের চেয়ে দরিদ্র।
অর্থনীতিবিদ নিক ব্লুমের গবেষণা অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের মাথাপিছু জিডিপি সম্ভাব্য অবস্থার তুলনায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ কম। অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির (ওবিআর) হিসাব বলছে, দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় আয়ে প্রায় ৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।
বাণিজ্যেও পড়েছে বড় প্রভাব। ইইউ এখনো যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, তবে নতুন সীমান্ত জটিলতা ও কাগজপত্রের ঝামেলায় পণ্য রপ্তানি কমে গেছে। সেবা খাতে কিছুটা উন্নতি হলেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়িক বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ প্রায় ১৮ শতাংশ কম হয়েছে এবং উৎপাদনশীলতা ৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শ্রমবাজারেও এর প্রভাব দেখা গেছে। যদিও বেকারত্ব অনেক সময় নিম্ন পর্যায়ে ছিল, কিন্তু বাস্তব মজুরি বৃদ্ধির হার স্থবির হয়ে পড়ে। মহামারির পর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণও কমে গেছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।
একই সময়ে যুক্তরাজ্যে নেট অভিবাসন ব্যাপকভাবে বেড়ে প্রায় ১০ লাখে পৌঁছায়, যদিও পরে তা নেমে আসে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন অভিবাসন নীতির কারণে ইইউ থেকে আসা শ্রমিকের সংখ্যা কমলেও ইইউ-বহির্ভূত দেশ থেকে অভিবাসন বেড়েছে।
সার্বিকভাবে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন— ব্রেক্সিট কোনো তাৎক্ষণিক ধস না ঘটালেও এটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধীরগতির পতন বা স্লো পাঞ্চার পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



