আয়ারল্যান্ডে ট্রাম্পের ব্যস্ত দিন, রাজপথে বিক্ষোভ

ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফরকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে উত্তাল ডাবলিনের রাজপথ। ছবি: রয়টার্স
রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা, কূটনৈতিক বৈঠক, অর্থনৈতিক আলোচনা ও গলফের ব্যস্ততায় আয়ারল্যান্ডে দিন কাটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে তার সফরের প্রতিবাদে ডাবলিনের রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান এবং তার প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান বিক্ষোভকারীরা। এর মধ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যও দিনের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়।
স্থানীয় সময় শনিবার সকাল ৮টা ২৩ মিনিটে ডাবলিন বিমানবন্দরে অবতরণ করে ট্রাম্পকে বহনকারী এয়ার ফোর্স ওয়ান। বিমান থেকে নামার পর তাকে স্বাগত জানান আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস। এ সময় বিমানবন্দর ও ডাবলিনজুড়ে জোরদার করা হয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। ট্রাম্পের গাড়িবহর বিমানবন্দর থেকে ফিনিক্স পার্কের দিকে যাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পুলিশের পাহারা, ব্যারিকেড ও যান চলাচলে বিধিনিষেধ দেখা যায়। ট্রাম্পের সফরকে কেন্দ্র করে আইরিশ পুলিশ, গার্ডা, ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়।
সকাল ৯টার কিছু পর ফিনিক্স পার্কের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবনে পৌঁছান ট্রাম্প। সেখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনোলি। গার্ড অব অনার, করমর্দন ও আনুষ্ঠানিক ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের সাক্ষাৎ।
আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা এর আগে প্রকাশ্যে করেছেন কনোলি। বিশেষ করে যুদ্ধ ও মানবিক সংকট নিয়ে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এবার মুখোমুখি সাক্ষাতেও শান্তি ও মানবিকতার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি। আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘ ছায়া এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের রক্তাক্ত সংঘাতের ইতিহাস কীভাবে দেশটিকে শান্তির মূল্য শিখিয়েছে, আলোচনায় উঠে আসে সেই প্রসঙ্গও।
কূটনৈতিক বার্তার প্রতীকী দিকও ছিল এ সাক্ষাতে। ট্রাম্পকে সেন্ট ব্রিজিডের ক্রস এবং আইরিশ কবি মাইকেল লংলির কবিতার সংকলন উপহার দেন কনোলি। বইটিতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি কবিতাও ছিল। উপহারের এই নির্বাচন আয়ারল্যান্ডের পক্ষ থেকে শান্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখা হয়।
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন থেকে বেরিয়ে ট্রাম্প যান ফার্মলেই হাউসে, যা আইরিশ রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে তার সঙ্গে বৈঠক করেন আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক সম্পর্কও ট্রাম্পের সফরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। প্রযুক্তি, ওষুধ, আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির বড় বিনিয়োগ রয়েছে আয়ারল্যান্ডে। দেশটির অর্থনীতিতেও এসব বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও ট্রাম্পের সফরে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
ফার্মলেই হাউসে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সামনে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, তিনি একটি ইউনাইটেড আয়ারল্যান্ড দেখতে চান। উত্তর ও দক্ষিণ আয়ারল্যান্ড একীভূত হলে সেটিকে তিনি দারুণ বিষয় হিসেবে দেখবেন বলেও মন্তব্য করেন। তার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত এমন কিছু ঘটবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দেয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ দীর্ঘদিনের সংঘাত, রক্তপাত, পরিচয়ের রাজনীতি এবং ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে ট্রাম্প বলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাজ্যেরও বলার অধিকার রয়েছে।
ডাবলিনে দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ডিয়ারফিল্ড রেসিডেন্সে। সেখানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, কূটনীতিক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে বক্তব্য দেন ট্রাম্প। প্রায় ৫০০ অতিথির উপস্থিতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, তার প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। বক্তব্যে গলফের প্রসঙ্গও আসে একাধিকবার।
ডাবলিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শেষে দুপুরের পর কাউন্টি ক্লেয়ারের ডুনবেগের উদ্দেশে রওনা হন ট্রাম্প। শ্যানন বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর হেলিকপ্টারে করে যান ডুনবেগে। সেখানে তার মালিকানাধীন ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ লিংকস অ্যান্ড হোটেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল আইরিশ ওপেন গলফ।
ডুনবেগে পৌঁছানোর পর আইরিশ ওপেনের খেলোয়াড়, দর্শক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ট্রাম্পকে ঘিরে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়। রাজনীতির ব্যস্ত রাজধানী থেকে সবুজ গলফ মাঠে গিয়ে দিনের শেষ ভাগ কাটান তিনি। গলফের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় সফরের এই অংশটিও বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে।
তবে ট্রাম্প যখন ডুনবেগে, তখন তার সফরের প্রতিবাদে ডাবলিনের রাজপথে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। প্ল্যাকার্ড হাতে ও স্লোগান দিয়ে তারা ট্রাম্পের নীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ছিল তাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। শ্যানন বিমানবন্দরেও প্রতিবাদ দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের কেউ ট্রাম্পকে যুদ্ধনীতির জন্য দায়ী করেন, আবার কেউ তার রাজনৈতিক দর্শনের সমালোচনা করেন।
তবে ট্রাম্পকে ঘিরে আয়ারল্যান্ডে প্রতিক্রিয়া ছিল একমুখী নয়। ডুনবেগের স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তার গলফ রিসোর্টের সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, তার গলফ রিসোর্ট কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, পর্যটক আকৃষ্ট করেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এই উপকূলীয় জনপদের পরিচিতি বাড়িয়েছে। তাদের কাছে ট্রাম্পের সফর শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহেরও সুযোগ।
একই ব্যক্তিকে কেউ দেখছেন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে, কেউ বিতর্কিত বিশ্বনেতা হিসেবে। আবার কারও কাছে ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্পর্কও প্রশ্নের বিষয়। এই ভিন্ন প্রতিক্রিয়াই আয়ারল্যান্ডে তার সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে উঠেছে।
দিনের শুরুতে ডাবলিন বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা, এরপর প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, ব্যবসায়ী ও কূটনীতিকদের সামনে বক্তব্য, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য এবং শেষে নিজের গলফ রিসোর্টে যাওয়া, ব্যস্ততায় কেটেছে ট্রাম্পের পুরো দিন। আর তার সফরের সমান্তরালে ডাবলিনের রাজপথে ছিল প্রতিবাদ ও ক্ষোভের স্লোগান।
রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার করতালি আর রাজপথের প্রতিবাদ, একই দিনে আয়ারল্যান্ডে দেখা গেছে দুই ভিন্ন চিত্র। ট্রাম্পের সফরে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংবেদনশীল রাজনীতি, গাজা ও যুদ্ধের প্রশ্ন এবং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ। দিন শেষে ডুনবেগের গলফ মাঠে সফরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও তাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের রেশ থেকে গেছে ডাবলিনের রাজপথে।




