বন্ধুর বদলে এআইকে ভরসা করছে জাপানের তরুণরা

মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন জাপানের এক তরুণী। ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে জাপানের কিশোর-কিশোরীরা। অনেক সিদ্ধান্তেই বন্ধু বা পরিবারের বদলে এআইকে ভরসা করছে তারা।
কেউ মারধরের ঘটনার ক্ষতিপূরণ কত চাইবে তা জিজ্ঞেস করছে চ্যাটবটকে। আবার কেউ আবার পারিবারিক সহিংসতার পর সাহায্য খুঁজছে এআইয়ের কাছে।
এমনকি এক কিশোরীর পরামর্শের জেরে আলোচনায় এসেছে এক তারকা বেসবল কোচের গ্রেপ্তারও।
ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—সবখানেই এআইয়ের এই নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। জরিপ বলছে, ব্যক্তিগত বিষয়ে এআই ব্যবহার করছে অর্ধেকের বেশি কিশোর-কিশোরী।
প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে কি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে তারা?
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক কিশোরী তার চার বান্ধবীর সঙ্গে মিলে মারধর করে এক ছেলেকে। আহত ছেলেটির কাছ থেকে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা উচিত তার উত্তর জানতে কিশোরীটি আশ্রয় নেয় এআইয়ের।
টোকিও মহানগর এলাকার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হাচিওজির এই ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, এটি জাপানি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগজনক একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তারা নিজেদের বিচার-বিবেচনা ব্যবহার না করে অনেক সময় অপরাধমূলক কাজেও পরামর্শ নিচ্ছে এআইয়ের।
দেশটির পুলিশ জানায়, হামলার শিকার স্কুলছাত্র কিশোরটিকে ভর্তি করা হাসপাতালে। পরে এ ঘটনায় অভিযোগ আনা হয় ওই পাঁচ কিশোরীর বিরুদ্ধে।
তবে জাপানে এআইয়ের সামাজিক প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় আরেকটি আলোচিত ঘটনার পর। এতে জড়িয়ে পড়েন দেশটির জনপ্রিয় বেসবল দল ইয়োমিউরি জায়ান্টসের ম্যানেজার ৪৭ বছর বয়সী শিননোসুকে আবে।
গত ২৫ মে টোকিওর বাসা থেকে তার ১৮ বছর বয়সী মেয়েকে মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। পরদিনই দলটির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় তার পদত্যাগের।
জাপানি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দুই মেয়ের মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আবে ক্ষুব্ধ হয়ে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন বড় মেয়েকে। পরে ওই মেয়ে চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চায়, ‘বাবার সহিংসতার শিকার হয়েছি। আমার কী করা উচিত?’
তাকে শিশু সুরক্ষা পরামর্শকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয় চ্যাটবট। সেই পরামর্শ অনুসরণ করে মেয়েটি। এটাই ছিল তার প্রথমবারের মতো শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ। এরপর বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে কর্মকর্তারা এসে গ্রেপ্তার করেন আবেকে।
পরে এক বিবৃতিতে মেয়েটি জানায়, তার অভিযোগ সরাসরি পুলিশের কাছে পৌঁছে যাবে, তা সে বুঝতে পারেনি। পুলিশ যখন তাদের বাসায় আসে, তখন সে বিস্মিত হয়। বাবাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে দেখে তার হৃদয় ভেঙে যায় বলেও উল্লেখ করে সে।
পরবর্তী সময়ে টোকিওর প্রসিকিউটররা সিদ্ধান্ত নেন আবের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র স্থগিত করার। ফলে আইনি জটিলতা শেষ হলেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার পেশাগত ও সামাজিক সুনাম।
ব্যক্তিগত সমস্যায় এআইয়ের শরণাপন্ন
জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিকসের তথ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইসাও এচিজেন বলেছেন, ‘অনেক জাপানি শিশু ও কিশোর প্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছে এআই ব্যবহারে।’
তার ভাষ্য, ‘এআই ব্যবহার করা সহজ, এটি সার্বক্ষণিক পাওয়া যায়। একই সঙ্গে বাবা-মা বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে এআইয়ের কাছে পরামর্শ চাওয়া তাদের কাছে বেশি স্বস্তিদায়ক।’
তিন সন্তানের বাবা এচিজেন যুবসমাজের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে খুব চিন্তিত। তার মতে, ‘সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং মানুষ যে তথ্য এআইকে দেয়, সেটিতে। আপনি আবর্জনা দিলে আবর্জনা পাবেন— এই কম্পিউটার বিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র এখানে প্রযোজ্য।’
তিনি জানিয়েছেন, অনেক সময় শিশুরা সমস্যার পূর্ণ প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে না। ফলে সীমিত বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর দেয় এআই।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
গত ১ মে প্রকাশিত জাপানের মন্ত্রিপরিষদ কার্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোরী ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে পরামর্শ নিয়েছে এআইয়ের।
এ ছাড়া একই কাজ করেছে ২০, ৩০ ও ৪০ বছর বয়সী নারীদের ৩০ শতাংশের বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩০ শতাংশের কম।
জরিপে আরও দেখা যায়, যারা এআইয়ের পরামর্শ নিয়েছে, তাদের ৩৮ শতাংশের বেশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়ে এআইয়ের পরামর্শের ওপর আস্থা রাখে। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ।
বন্ধুর চেয়ে এআই
টোকিওর চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ইজুমি সুজি বলেছেন, ‘জাপানি তরুণরা অন্য দেশের তরুণদের তুলনায় এআইয়ের প্রতি বেশি আকৃষ্ট।’
তিনি জানালেন, তার শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বলে যে তাদের শতাধিক বন্ধু থাকলেও খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু খুব কম। আর যাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, তারাও সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে জটিল বা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চায় না। ফলে এআইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে তারা।
তার মতে, জাপানের কিশোর-কিশোরীরা পড়াশোনা, বন্ধুত্ব, প্রেম থেকে শুরু করে জীবনের নানা বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছে এআইয়ের।
সুজি বলেছেন, এআই খুব সহজ একটি মাধ্যম। এটি কাউকে বিচার করে না, জবাবদিহি চায় না, বরং ব্যবহারকারী যে ধরনের উত্তর চায়, অনেক সময় সেদিকেই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের সুরক্ষার জন্য এআই ব্যবহারে বয়সভিত্তিক সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত, যেমনটি সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রে অনেক দেশ করেছে।
অধ্যাপক এচিজেন বলেছেন, আজকের কিশোর-কিশোরীরাই আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবে। যদি তারা এখন থেকেই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত এআইয়ের পরামর্শে নেয়, তাহলে নিজেরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা কীভাবে অর্জন করবে?
তার সতর্কবার্তা, যদি মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বড় অংশই এআইনির্ভর হয়ে যায়, তবে সেটি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক হবে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট







